ইরাকের আইন আল‑আসাদ বিমানঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণভাবে সরে গেছে, আর ঘাঁটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখন ইরাকি সেনাবাহিনীর হাতে। ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শনিবার এই পরিবর্তনটি সরকারি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্যান্য মিত্র দেশের সৈন্যও এই ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে এসেছে, ফলে এখন ঘাঁটির নিরাপত্তা ও পরিচালনা সম্পূর্ণভাবে ইরাকের নিজস্ব সেনা পরিচালনা করছে। এই পদক্ষেপটি ২০২৪ সালে ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সামরিক প্রত্যাহার চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চুক্তির পূর্বে, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী বাগদাদে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে লক্ষ্যবস্তু করে গুলি চালায়। এই আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ইরান আইন আল‑আসাদ ঘাঁটিতে বিশাল পরিমাণে মিসাইল নিক্ষেপ করে, যা ঘাঁটির অবকাঠামোকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
মিসাইল আক্রমণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন সৈন্যদের মধ্যে মানসিক চাপ ও উদ্বেগের লক্ষণ দেখা দেয়। সেই সময়ের পর থেকে ঘাঁটির নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন।
২০২৪ সালে ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে উভয় পক্ষই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সামরিক উপস্থিতি হ্রাসের শর্ত যুক্ত করে। চুক্তির অধীনে আইন আল‑আসাদ ঘাঁটি থেকে ধাপে ধাপে বাহিনীর প্রত্যাহার নির্ধারিত হয়, যা শেষ পর্যন্ত ঘাঁটির সম্পূর্ণ শূন্যীকরণে পৌঁছাবে।
প্রত্যাহার প্রক্রিয়ার সূচনা কখন ঠিক হয়েছে তা সরকারীভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে জানানো হয়েছে যে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে শত শত সৈন্য ঘাঁটি ত্যাগ করবে এবং ২০২৬ সালের মধ্যে পুরো ঘাঁটি খালি হবে। এই সময়সূচি অনুযায়ী, বর্তমান পর্যন্ত অধিকাংশ বাহিনী ইতিমধ্যে সরে গেছে।
ইরাকি সেনাবাহিনীর একজন কর্নেল এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, মার্কিন ও মিত্র সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ ইউনিট এখন আর ঘাঁটিতে নেই। তিনি উল্লেখ করেন যে, এখনও কিছু ছোট দল লজিস্টিক কাজের জন্য সাময়িকভাবে উপস্থিত রয়েছে, তবে তাদের কাজ শেষ হলে তারা ও চলে যাবে।
কর্ণেল আরও জানান, নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিবেচনায় অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে অবশিষ্ট কর্মীসমূহের সংখ্যা সীমিত এবং তাদের দায়িত্ব মূলত সরঞ্জাম ও সরবরাহের স্থানান্তর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। এই কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই প্রত্যাহার ইরাকের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলেছে, এবং ঘাঁটির হস্তান্তর ইরাককে তার নিজস্ব নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করবে।
অঞ্চলীয় বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ইরাকের এই পদক্ষেপটি পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা গতিবিধিতে নতুন ভারসাম্য আনতে পারে। ইরান-ইরাক সম্পর্কের জটিলতা, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং তুর্কি ও কুর্দি গোষ্ঠীর স্বার্থের সঙ্গে এই প্রত্যাহার কিভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা পরবর্তী মাসে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, ইরাকের সরকার এই ধাপকে তার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি হ্রাসের মাধ্যমে ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমঝোতা প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য রয়েছে।
ভবিষ্যতে ঘাঁটির সম্পূর্ণ শূন্যীকরণ হলে, ইরাকের নিরাপত্তা সংস্থা নতুন প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা প্রকাশ করতে পারে, যা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনে সহায়ক হবে। বর্তমানে, ঘাঁটির হস্তান্তর প্রক্রিয়া মসৃণভাবে চলমান এবং ইরাকের নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় প্রত্যাশা করে যে, এই পরিবর্তনটি দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করবে।



