বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড ইস্যু করে একে অপরের কাছ থেকে ক্রয়-বিক্রয় চালিয়ে আসছে, যা তাত্ত্বিকভাবে মূলধন অনুপাত বাড়ায়, তবে ঝুঁকি সিস্টেমের মধ্যে ঘনিয়ে আনে।
বন্ডের মাধ্যমে ঝুঁকি হ্রাসের বদলে পুনঃবণ্টন ঘটলে ব্যাংকিং সেক্টরের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূলধন শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে এই পদ্ধতি গ্রহণ করা হলেও, তা বাস্তবে নতুন তহবিলের প্রবাহ ঘটায় না।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রথমে নিজস্ব সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড প্রকাশ করে, তারপর একই ধরনের বন্ড অন্য ব্যাংক থেকে কিনে নেয়। এই চক্রে মূলধন কাগজে বাড়লেও, প্রকৃত নগদ প্রবাহ সীমিত থাকে।
বন্ডের ক্রয়-বিক্রয় কেবলমাত্র ব্যাংকগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায়, কর্পোরেট বা ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায় না। ফলে বন্ডের মূল উদ্দেশ্য—বহিরাগত তহবিল আকর্ষণ—সম্পূর্ণ হয় না।
একে সহজভাবে বলা যায়, এক পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িগুলো একে অপরকে ঋণ দিচ্ছে, যেখানে বৃহত্তর আর্থিক গোষ্ঠীর সঙ্গে লেনদেন না করে ঝুঁকি ঘূর্ণায়মান থাকে। ঝুঁকি অদৃশ্য হয় না, বরং একই সেক্টরের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়।
২০২২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তিন বছরের সময়কালে, সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাবঅর্ডিনেটেড বন্ডের প্রায় ৮০ শতাংশ বিনিয়োগকারী ব্যাংকই ছিল। এই উচ্চমাত্রার অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরবর্তীতে সেক্টরের দুর্বলতা বাড়িয়ে তুলেছে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের ওপর মিশ্রণ প্রক্রিয়া আরম্ভ করে, যা পূর্বে উল্লিখিত বন্ডের চক্রের সরাসরি ফলাফল হিসেবে দেখা যায়। মিশ্রণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেক্টরের ঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্য নেওয়া হয়।
মিশ্রণাধীন চারটি ব্যাংক মিলিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রায় ২,৯০০ কোটি টাকা মুদারাবা সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড এবং ১,০০০ কোটি টাকার বেশি মুদারাবা পারপেচুয়াল বন্ডের দায় বহন করে। এই মোট প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা কোনো জামানত সুরক্ষা পায় না।
ডিপোজিটের মতো সুরক্ষা না থাকায়, বন্ডে বিনিয়োগ করা তহবিল ব্যাংকের ব্যর্থতার ক্ষেত্রে সহজে হারিয়ে যেতে পারে। তাই এই পরিমাণ সম্পদ ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটে থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
নিয়ন্ত্রক কাঠামোতে সাবঅর্ডিনেটেড বন্ডকে টিয়ার-২ মূলধন হিসেবে গণ্য করা হয়। ব্যাঙ্কের দেউলিয়াত্বে, এই বন্ডের পরিশোধ ডিপোজিটর এবং সিনিয়র ক্রেডিটরদের পরেই হয়, ফলে বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি বাড়ে এবং রিটার্নের প্রত্যাশা ততটা উচ্চ হয়।
ব্যাংকগুলো এই বন্ডকে চাহিদা ও সময়সীমা ভিত্তিক দায় থেকে বাদ দিয়ে, বন্ডের অর্থ দিয়ে ঋণ প্রদান করে। ফলে তরলতা মেলামেশা ব্যাহত হয় এবং দুর্বল সিস্টেমে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
একই বন্ডের পারস্পরিক ক্রয় নতুন মূলধন প্রবেশের সুযোগ না দেয়। যদিও কিছু কর্পোরেট সংস্থা বন্ড কিনে থাকে, তাদের বেশিরভাগই পেনশন ফান্ড বা প্রভিডেন্ট ফান্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগ করে, যা প্রকৃত বাজারের তহবিল প্রবাহকে সীমিত করে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, যদি এই চক্র অব্যাহত থাকে, তবে ব্যাংক সেক্টরে আরও মিশ্রণ বা পুনর্গঠন প্রয়োজন হতে পারে। ঝুঁকি হ্রাসের জন্য বাস্তবিক মূলধন সংগ্রহ, বন্ডের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং টিয়ার-২ মূলধনের ব্যবহার সীমিত করা জরুরি।



