ইরানের সরকার ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন নীতি অনুসারে, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট আর নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হবে না; এর পরিবর্তে সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি স্বদেশীয় নেটওয়ার্ক চালু হবে।
এই স্বদেশীয় নেটওয়ার্কে শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত সেবা থাকবে। পরিকল্পনায় দেশীয় সার্চ ইঞ্জিন, মেসেজিং অ্যাপ, ন্যাভিগেশন সেবা এবং স্থানীয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম অন্তর্ভুক্ত, যা প্রায়শই ‘ইরানি নেটফ্লিক্স’ নামে উল্লেখ করা হয়।
সরকারি সূত্রের মতে, ২০২৬ সালের পর আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটের কোনো পুনরায় প্রবেশের সুযোগ থাকবে না। সেই সময়ের আগে সীমিত এবং ফিল্টার করা বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবে কেবল নিরাপত্তা অনুমোদনপ্রাপ্ত বা সরকারি যাচাই প্রক্রিয়া উত্তীর্ণ ব্যক্তিরা।
সাধারণ নাগরিকদের জন্য শুধুমাত্র একটি জাতীয় ইন্টারনেট উপলব্ধ হবে, যা সম্পূর্ণভাবে দেশীয় অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল এবং বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক থেকে আলাদা। এই ব্যবস্থা তথ্যের প্রবাহকে রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত করবে।
ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নতার সূচনা হয় ৮ জানুয়ারি, যখন দেশের বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর ১২ দিনের ধারাবাহিক প্রতিবাদে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। এই সময়ে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা এই ব্ল্যাকআউটকে ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ এবং কঠোর ইন্টারনেট বন্ধ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তুলনা করা হলে, ২০১১ সালের মিশরের তহরির স্কয়ার আন্দোলনের সময়ের ইন্টারনেট বন্ধের চেয়েও এটি দীর্ঘস্থায়ী।
ইরানের সরকারি মুখপাত্র জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটের বন্ধ কমপক্ষে নওরোজ, অর্থাৎ পারস্যের নববর্ষ (২০ মার্চ) পর্যন্ত বজায় থাকবে। এই সময়ের মধ্যে কোনো আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটে প্রবেশের সুযোগ থাকবে না।
প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, নতুন নেটওয়ার্কটি একটি সমান্তরাল ডিজিটাল অবকাঠামো গঠন করবে, যার ওপর পুরো নিয়ন্ত্রণ থাকবে সরকারী সংস্থার। ফলে তথ্যের সঞ্চার, অনুসন্ধান এবং যোগাযোগ সবই রাষ্ট্রের নীতিমালা অনুসারে সীমাবদ্ধ হবে।
এই পরিবর্তন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলবে। বিদেশি সামাজিক মিডিয়া, গ্লোবাল সার্চ ইঞ্জিন এবং আন্তর্জাতিক ই-কমার্স সাইটে প্রবেশ সীমিত হবে, ফলে তথ্যের বহুমুখিতা ও ব্যবসায়িক সুযোগ কমে যাবে।
অন্যদিকে, সরকারীভাবে অনুমোদিত সেবা ব্যবহারকারী জনগণকে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে যোগাযোগের সুবিধা প্রদান করা হবে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে তথ্যের স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের সুরও বাড়ছে।
সারসংক্ষেপে, ইরানের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সংযোগের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বদেশীয় প্রযুক্তি ও সেবার ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এই জাতীয় নেটওয়ার্ক কীভাবে কাজ করবে এবং এর সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে।



