ইউক্রেনের একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল যুক্তরাষ্ট্রে অবতরণ করেছে, যেখানে তারা চার বছর ধরে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার অংশ হিসেবে আমেরিকান নেতৃত্বাধীন শান্তি প্রস্তাবের বিবরণে মনোনিবেশ করবে। দলটি শনিবারই ওয়াশিংটন ডি.সি.‑এর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গৃহে পৌঁছায় এবং মায়ামিতে নির্ধারিত বৈঠকের প্রস্তুতি নেয়।
দলটির প্রধান প্রতিনিধি হলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কির চিফ অব স্টাফ কিরিলো বুদানোভ, যিনি টেলিগ্রাম চ্যানেলে জানিয়েছেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে শর্তাবলী ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিশদ আলোচনা করতে এসেছেন। তার বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেছেন যে এই আলোচনাগুলি যুদ্ধের সমাপ্তি এবং স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য।
বুদানোভের সঙ্গে রয়েছে ইউক্রেনের দুই অভিজ্ঞ আলোচক রুস্তেম উমেরভ ও দাভিদ আরাখামিয়া, যারা পূর্বে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ইউক্রেনের অবস্থান উপস্থাপন করেছেন। এই তিনজনের সমন্বয়ে গঠিত দলটি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর সচিব ড্যান ড্রিসকলের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করবে।
বৈঠকের স্থান নির্ধারিত হয়েছে ফ্লোরিডার মায়ামি, যেখানে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রায় আক্রমণের চতুর্থ বার্ষিকীর কয়েক দিন আগে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এই সময়সূচি উভয় পক্ষের জন্য সংকেত দেয় যে শান্তি প্রক্রিয়াকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া জরুরি, যাতে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি কমানো যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা নিতে চেষ্টা করছেন। তিনি উভয় পক্ষের প্রতি হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন যে বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করেনি, তবে তিনি ইউক্রেনকে নির্দিষ্ট শান্তি পরিকল্পনার শর্ত মেনে নিতে চাপ দিচ্ছেন।
ট্রাম্পের এই চাপের মূল উদ্দেশ্য হল রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি ও নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিশ্চিত করা, যাতে ইউক্রেনের ভূখণ্ডীয় অখণ্ডতা রক্ষা পায়। তবে এখন পর্যন্ত এই প্রচেষ্টা থেকে উল্লেখযোগ্য ফলাফল দেখা যায়নি, এবং উভয় দেশের নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রদূত পূর্বে জানিয়েছিলেন যে আসন্ন আলোচনায় নিরাপত্তা গ্যারান্টি, যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন এবং ইউক্রেনের সার্বিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে বিশদ আলোচনা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে এই বিষয়গুলোই শান্তি চুক্তির মূল স্তম্ভ হবে এবং সেগুলোর ওপরই চূড়ান্ত চুক্তি ভিত্তিক হবে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি শুক্রবারের একটি বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন যে তিনি আশা করছেন আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। তার মতে, এই চুক্তি যুদ্ধের সমাপ্তি এবং ইউক্রেনের পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করবে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন নিশ্চিত করবে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে এই চুক্তি স্বাক্ষর হলে ইউক্রেনের কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হবে এবং রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে। একইসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কও পুনরায় গঠন হতে পারে, যা অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করতে পারে।
অবশেষে, মায়ামিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আলোচনার ফলাফল কীভাবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রভাব ফেলবে তা এখনও অনিশ্চিত। তবে স্পষ্ট যে, ইউক্রেনের প্রতিনিধি দল এবং যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে এই বৈঠক যুদ্ধের সমাপ্তি এবং স্থায়ী শান্তি গড়ে তোলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই আলোচনার পরবর্তী ধাপগুলোতে চুক্তির বিশদ শর্তাবলী নির্ধারণ, নিরাপত্তা গ্যারান্টি প্রদান এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল সংগ্রহ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। উভয় পক্ষের সমঝোতা যদি সফল হয়, তবে এটি ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য একটি মাইলফলক হতে পারে।



