শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই খাবারের পরে পেট ফুলে যাওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, ক্ষুধা কমে যাওয়া বা হালকা ভারী অনুভবের মত অস্বস্তি অনুভব করেন। এই লক্ষণগুলো মৌসুমী পরিবর্তনের স্বাভাবিক প্রভাব হলেও বিজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে হজমের গতি কেন ধীর হয়ে যায় তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
হজম একটি জটিল প্রক্রিয়া যা যথেষ্ট রক্ত সঞ্চালন, পেশীর সংকোচন, এনজাইম, হরমোন, যথাযথ জলীয়তা এবং শারীরিক কার্যকলাপের সমন্বয় প্রয়োজন। শীতের সময় এই উপাদানগুলো একসাথে পরিবর্তিত হয়, ফলে হজমের কার্যকারিতা হ্রাস পায়।
ঠাণ্ডা পরিবেশে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হল রক্তনালীর সংকোচন, অর্থাৎ ভাসোকনস্ট্রিকশন। এই প্রক্রিয়া মূল অঙ্গগুলোতে রক্তের প্রবাহ বাড়িয়ে তাপ সংরক্ষণে সহায়তা করে, তবে পেট ও অন্ত্রের মতো পার্শ্বিক অঙ্গগুলোতে রক্ত সরবরাহ কমে যায়। রক্তের প্রবাহ কমে গেলে পেটের খাবার পচতে ও অন্ত্রের পেশী সঠিকভাবে সংকুচিত হতে সময় বেশি লাগে।
ফলস্বরূপ, খাবার পেট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার গতি ধীর হয়ে যায়, যা পেটের অস্বস্তি, হজমে ব্যাঘাত এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের দিকে নিয়ে যায়। একই সময়ে অন্ত্রের চলাচলও কমে যায়, ফলে খাবার দীর্ঘ সময় ধরে পেটের মধ্যে থাকে।
শীতকালে শারীরিক কার্যকলাপের পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। দিনের আলো কমে যাওয়া, তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং ঘরের ভেতরে সময় কাটানোর প্রবণতা মানুষকে কম হাঁটতে ও কম ব্যায়াম করতে বাধ্য করে। শারীরিক আন্দোলন হজমের পেশীকে উদ্দীপিত করে, যা খাবারকে অন্ত্রের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই ব্যায়াম হ্রাস হজমের গতি কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ।
অল্প মাত্রার দৈনিক হাঁটা বা হালকা ব্যায়ামই অন্ত্রের পেশীর স্বাভাবিক সংকোচন বজায় রাখতে যথেষ্ট। শীতের সময় নিয়মিত হাঁটা, বাড়িতে স্ট্রেচিং বা হালকা যোগব্যায়াম অন্ত্রের গতি বাড়িয়ে হজমকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
ঠাণ্ডা আবহাওয়া তৃষ্ণা কমিয়ে দেয়, ফলে মানুষ গরম চা বা কফি ছাড়া বেশি জল পান করে না। যদিও শীতেও শ্বাসপ্রশ্বাস ও প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে তরল হারায়, তবু তরল গ্রহণের পরিমাণ গ্রীষ্মের তুলনায় কম থাকে।
পর্যাপ্ত জল না পান করলে কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়ে, কারণ কোলন মল থেকে অতিরিক্ত জল শোষণ করে মলকে কঠিন করে দেয়। ফলস্বরূপ মলত্যাগের সময় ব্যথা ও অস্বস্তি বৃদ্ধি পায়, এবং হজমের গতি আরও ধীর হয়ে যায়।
শীতকালে খাবারের ধরনও পরিবর্তিত হয়। গরম স্যুপ, ভাজা খাবার, মশলাদার মাংসের পদ এবং পরিশোধিত শস্যের ব্যবহার বাড়ে, যেখানে শাকসবজি ও ফলের পরিমাণ কমে যায়। এই পরিবর্তন ফাইবারের গ্রহণ কমিয়ে দেয়, যা অন্ত্রের চলাচলকে আরও ধীর করে।
বাংলাদেশের শীতকালীন খাবারে প্রায়শই ইলিশের ভাজা, মশলাদার চিংড়ি, তেলযুক্ত আলুর চিপস এবং গরম ভাতের সঙ্গে বিভিন্ন তরকারি দেখা যায়। যদিও এই খাবারগুলো স্বাদে সমৃদ্ধ, তবু ফাইবারের ঘাটতি হজমে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
হজমের গতি বজায় রাখতে প্রথমে দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপ বাড়ানো জরুরি। ছোট হাঁটা, সিঁড়ি ওঠা বা বাড়িতে হালকা ব্যায়াম রুটিন গড়ে তোলা সহজে করা যায়। এছাড়া গরম পানীয়ের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি গ্রহণ করা উচিত; একদিনে কমপক্ষে আট গ্লাস (প্রায় দুই লিটার) পানি লক্ষ্য রাখা ভালো।
ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার—যেমন পালং শাক, মুলা, গাজর, আপেল, কলা, ডাল এবং সম্পূর্ণ শস্য—খাবারের সঙ্গে যুক্ত করলে অন্ত্রের গতি ত্বরান্বিত হয় এবং মলকে নরম রাখতে সাহায্য করে। তাছাড়া হালকা মশলা, আদা ও হলুদের মতো প্রাকৃতিক উপাদান হজমে সহায়তা করে, তবে অতিরিক্ত তেল ও মশলা এড়িয়ে চলা উচিত।
সারসংক্ষেপে, শীতের ঠাণ্ডা রক্তনালীর সংকোচন, কম শারীরিক কার্যকলাপ, পর্যাপ্ত তরল না গ্রহণ এবং ফাইবারের ঘাটতি হজমকে ধীর করে দেয়। নিয়মিত হাঁটা, পর্যাপ্ত পানি পান এবং ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো কমানো সম্ভব। আপনি কি শীতকালে আপনার হজমের যত্ন নেওয়ার জন্য কোনো নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে চান?



