৩৮তম ইউরোপীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার সমারোহে নরওয়ের মেলোড্রামা ‘Sentimental Value’ সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করেছে। এই অনুষ্ঠানটি শনি-রবিবার রাতের দিকে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে লাইভ সম্প্রচারে উপস্থাপিত হয়। পুরস্কার জয়ের মাধ্যমে ছবিটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের আলোচনায় নতুন মাত্রা পেয়েছে।
‘Sentimental Value’ ছবিটি সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘সেরা চলচ্চিত্র’ শিরোপা জিতেছে, পাশাপাশি পরিচালক জোয়াকিম ত্রিয়ের ‘সেরা পরিচালক’ পুরস্কারও পেয়েছে। প্রধান অভিনেতা স্টেলান স্কার্সগার্ড ও রেনাটে রেইনসভে দুজনেই ‘সেরা অভিনেতা’ ও ‘সেরা অভিনেত্রী’ বিভাগে সম্মানিত হয়েছেন। স্ক্রিনপ্লে বিভাগে ত্রিয়ের এবং এস্কিল ভগ্টের যৌথ রচনাকে ‘সেরা স্ক্রিনপ্লে’ পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে হানিয়া রানি ছবির সাউন্ডট্র্যাকের জন্য ‘সেরা সঙ্গীত’ পুরস্কার পেয়ে গর্বিত হয়েছেন।
এই জয়টি ‘Sentimental Value’ কে অস্কার পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আরও দৃঢ় করেছে। শিল্প সমালোচকরা ইতিমধ্যে ছবিটিকে ‘সেরা ছবির’ প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করছেন, এবং স্কার্সগার্ড ও রেইনসভের পারফরম্যান্সকে ‘সেরা অভিনেতা’ ও ‘সেরা অভিনেত্রী’ বিভাগে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ত্রিয়ের নামও ‘সেরা পরিচালক’ ক্যাটাগরিতে আলোচনার শীর্ষে রয়েছে।
স্প্যানিশ চলচ্চিত্র ‘Sirāt’, যেটি ওলিভার ল্যাক্সের পরিচালনায় তৈরি, বহু বিভাগে পুরস্কার জিতেছে। এই চলচ্চিত্রটি ‘সেরা প্রোডাকশন ডিজাইন’, ‘সেরা সাউন্ড ডিজাইন’, ‘সেরা এডিটিং’, ‘সেরা সিনেমাটোগ্রাফি’ এবং প্রথমবারের মতো ‘সেরা কাস্টিং’ বিভাগে সম্মানিত হয়েছে। ‘Sirāt’ স্পেনের অস্কার প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় এই জয়গুলো তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
‘Sirāt’ এর বিজয়ী বিভাগগুলো ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা তুলে ধরেছে। প্রোডাকশন ডিজাইনের সূক্ষ্মতা, সাউন্ডের গভীরতা, এডিটিংয়ের রিদম এবং ক্যামেরার কাজের নিখুঁততা সকলেই সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে। কাস্টিং বিভাগে প্রথমবারের মতো পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে, যা শিল্পের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নির্দেশ করে।
জার্মানির ‘Sound of Falling’ চলচ্চিত্রটি ‘সেরা কস্টিউম ডিজাইন’ পুরস্কার জিতেছে। এই চলচ্চিত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের একাডেমি পুরস্কারের আন্তর্জাতিক ফিচার বিভাগে জার্মানির প্রবেশিকা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। কস্টিউম ডিজাইনের মাধ্যমে ছবির সময়কাল ও পরিবেশের পুনর্নির্মাণকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইতালির অ্যানিমেশন ফ্যান্টাসি ‘Arco’ ইউরোপীয় অ্যানিমেশন ফিচার ফিল্মের শীর্ষ পুরস্কার অর্জন করেছে। উগো বিয়েনভেনু পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি তার সৃজনশীল ভিজ্যুয়াল স্টাইল এবং গল্পের গভীরতার জন্য প্রশংসিত হয়েছে। অ্যানিমেশন বিভাগে এই জয়টি ইউরোপীয় অ্যানিমেশন শিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
বুগোনিয়া চলচ্চিত্রের জন্য টর্সটেন উইটে ‘সেরা হেয়ার ও মেকআপ’ বিভাগে প্রথম পুরস্কার অর্জন করেছেন। এই পুরস্কারটি ইউরোপীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারগুলিতে নতুন ক্যাটাগরি হিসেবে যুক্ত হয়েছে, যা শিল্পের নানাবিধ দিককে স্বীকৃতি দেয়।
সমারোহের সময় ইরানীয় পরিচালক জাহানগির পনাহি একটি বিশেষ বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গণহত্যার ঘটনাগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন। তার বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন যে, নিরবতা ও অকার্যকরতা সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে এবং তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পনাহির এই বক্তব্যের পর সমাবেশে তালি ও সমর্থনের ঝড় দেখা যায়। তিনি ইরানের জনগণের কষ্টের প্রতি বিশ্বজনের দায়িত্ববোধ জোর দিয়ে বলেন যে, এক দেশকে উপেক্ষা করা মানে পুরো মানবজাতিকে ঝুঁকিতে ফেলা। তার আহ্বানটি চলচ্চিত্র শিল্পের বাইরে সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার গুরুত্বকে তুলে ধরেছে।
পুরস্কার অনুষ্ঠানটি রাজনৈতিক বিষয়কে কেন্দ্র করে পরিচালিত হওয়ায় অনেক দর্শক ও শিল্পকর্মী এই দিকটি প্রশংসা করেছেন। পূর্বে গল্ডেন গ্লোবসের মতো ‘রাজনীতি না’ নীতি অনুসরণ করা হলে, এই বছর ইউরোপীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারগুলোতে রাজনৈতিক সচেতনতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
এই ধরনের রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি পুরস্কার অনুষ্ঠানের সামাজিক প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলেছে এবং শিল্পের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। চলচ্চিত্র শিল্পের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতে আরও বেশি সামাজিক বিষয়কে আলোচনার কেন্দ্রে আনতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ৩৮তম ইউরোপীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার সমারোহটি শিল্পের সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা এবং সামাজিক দায়িত্বের সমন্বয় ঘটিয়েছে। ‘Sentimental Value’ এর বিশাল জয়, ‘Sirāt’ এর বহু বিভাগে পুরস্কার, এবং পনাহির রাজনৈতিক বক্তব্য একসাথে ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের বৈচিত্র্য ও গভীরতাকে প্রকাশ করেছে।
এই পুরস্কারগুলো ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের অবস্থানকে আরও মজবুত করবে।



