বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী টেক্সটাইল নকশি কান্থা ও জামদানি আজ আধুনিক ফ্যাশনের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। পুরনো সাড়ি, লুঙ্গি থেকে তৈরি হাতে সেলাই করা কাঁথা এবং শতাব্দীর পুরনো জামদানি বুনন এখন শহুরে পোশাক, ব্যাগ এবং জ্যাকেটের নকশায় রূপান্তরিত হচ্ছে, যা দেশীয় ও বিদেশী উভয় বাজারে প্রশংসা পাচ্ছে।
নকশি কান্থা মূলত গ্রামীণ নারীদের দ্বারা পুরনো পোশাক পুনর্ব্যবহার করে তৈরি করা হতো। সেলাইয়ের মধ্যে পাখি, লতা, নৌকা ও দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্যাবলি যুক্ত করে ব্যক্তিগত গল্প গড়ে তোলার এই শিল্পটি দীর্ঘদিন ঘরোয়া সজ্জা হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ঐতিহ্যবাহী কাঁথা আধুনিক ডিজাইনের সঙ্গে মিশে নতুন রূপ পেয়েছে। তরুণ ডিজাইনাররা কাঁথার সূক্ষ্ম সেলাইকে স্ট্রিটওয়্যার, হ্যান্ডব্যাগ এবং জ্যাকেটের প্যাটার্নে রূপান্তরিত করে, যা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
সিজের প্রতিষ্ঠাতা সামাহা সুভা এই পরিবর্তনের অগ্রদূত। তিনি তার লেবেল SIZ-এ নকশি কান্থাকে ক্যানভাসের মতো ব্যবহার করে বিভিন্ন থিমের সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেন। তার মতে, এই হস্তশিল্পটি চিত্রাঙ্কনের মতো, যেখানে সেলাইয়ের মাধ্যমে স্বপ্নের ফুল, জটিল প্যাটার্ন বা এমনকি ড্রাগনের মতো কল্পনাপ্রসূত চিত্রও প্রকাশ করা যায়।
সামাহা সুভা উল্লেখ করেন, “কাঁথা দিয়ে আমি নিজের কল্পনা প্রকাশের সুযোগ পাই; এটি আমাকে রঙ, রূপ ও গল্পের মিশ্রণে স্বাধীনতা দেয়।” এই দৃষ্টিভঙ্গি নকশিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী সেলাইকে আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গে মিশিয়ে অনন্য পণ্য তৈরি হয়।
সিজের সাম্প্রতিক সংগ্রহে রঙিন জ্যাকেট, মিনিমালিস্ট ব্যাগ এবং স্লিক হুডি অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোতে নকশি কান্থার সূক্ষ্ম সেলাই স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এই পণ্যগুলো স্থানীয় বাজারে পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শোতে প্রদর্শিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের হস্তশিল্পের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে, জামদানি বুনন ঢাকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চালু রয়েছে। এই বুনন প্রক্রিয়া অত্যন্ত শ্রমসাধ্য; অতিরিক্ত সূতা হাতে যুক্ত করে সূক্ষ্ম ফুলের প্যাটার্ন বা পানির ফোঁটা মত নকশা তৈরি করা হয়, যা কাপড়ে হালকা ভাসমান প্রভাব সৃষ্টি করে।
জামদানি ঐতিহ্যবাহীভাবে গৃহস্থালি ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হতো, তবে এখন এটি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় উচ্চ মূল্যায়ন পেয়েছে। ডিজাইনাররা জামদানির স্বচ্ছ, হালকা কাপড়কে আধুনিক কুর্তা, শার্ট এবং গাউন হিসেবে পুনর্গঠন করে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী মোটিফগুলো আধুনিক কাটের সঙ্গে মিশে নতুন শৈলী গড়ে তোলেন।
এই পুনর্নবীকরণে জামদানির সূক্ষ্মতা ও নকশি কান্থার রঙিন সেলাই উভয়ই বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন উত্সাহীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বুটিকগুলো এখন বাংলাদেশের এই টেক্সটাইলকে উচ্চমানের লাক্সারি আইটেম হিসেবে বিবেচনা করে, যা স্থানীয় শিল্পীদের জন্য নতুন বাজারের দরজা খুলে দিয়েছে।
উল্লেখযোগ্য যে, এই ধরণের পুনর্গঠন টেকসই ফ্যাশনের দিকেও অবদান রাখে। পুরনো পোশাককে পুনর্ব্যবহার করে নতুন পণ্য তৈরি করা পরিবেশের উপর কম চাপ ফেলে এবং ঐতিহ্যবাহী কারিগরদের কাজকে আধুনিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে।
সারসংক্ষেপে, নকশি কান্থা ও জামদানি এখন শুধুমাত্র অতীতের স্মারক নয়; তারা আধুনিক ডিজাইনের মাধ্যমে নতুন জীবনে প্রবেশ করেছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ঐতিহ্যের গর্ব বাড়িয়ে তুলেছে। ভবিষ্যতে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে, আরও বেশি তরুণ ডিজাইনার এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে বিশ্ব ফ্যাশনে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হবে।



