ঢাকায় শান্তো‑মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অফ ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি (SMUCT) এর ছাত্র ও সদ্য স্নাতকরা দেশের ফ্যাশন শিল্পের পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারা কেবল রানের পথে নয়, বরং কর্মশালা, ক্লাসরুম ও ছোট স্টুডিওতে নকশা, সেলাই ও গবেষণার মাধ্যমে নতুন ধারণা গড়ে তুলছে। এই তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি ফ্যাশনকে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংযোগস্থল হিসেবে পুনর্গঠন করছে।
ফ্যাশনকে শুধুমাত্র সাজসজ্জা নয়, ইতিহাসের অনুবাদ, ব্যক্তিগত পরিচয় ও সমসাময়িক বাস্তবতার প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে তারা গ্রহণ করেছে। তাদের কাজের মূল লক্ষ্য হল পুরোনো মোটিফকে পুনরায় ব্যাখ্যা করে আধুনিক রূপে উপস্থাপন করা, যাতে ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের সাথে সংলাপ করতে পারে।
শান্তো‑মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. ইমরান হোসেন বলেন, থিম্যাটিক ডিজাইনের পদ্ধতি বদলে গিয়ে এখন মোটিফের গভীর গবেষণাকে সূচনা বিন্দু হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পূর্বে একটি সংস্কৃতি বা পণ্য বেছে নিয়ে তার চারপাশে নকশা গড়ে তোলা হতো; এখন তা মোটিফের মূল অর্থ উন্মোচনের জন্য প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হয়।
হোসেনের কাজ ১৯৪০‑এর ফ্যাশন ও গ্রামীণ জীবনের মিশ্রণ, তবে তার পদ্ধতি একই রকম: মোটিফ চিহ্নিত করা, তার পেছনের গল্প বোঝা এবং তা মাধ্যমে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া। মোটিফকে অতিরিক্ত সাজসজ্জা নয়, বরং অর্থবহ উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা তার নকশার মূল বৈশিষ্ট্য।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন শিক্ষার্থী উম্মে জামিলা মোটিফের সঙ্গে জাতীয় প্রতীককে যুক্ত করে কাজ করেন। তার পূর্বের থিমগুলোর মধ্যে ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৬ই ডিসেম্বর এবং জলপদ্মের মতো জাতীয় চিহ্ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি বলেন, জাতীয় বিষয়গুলোতে তার আগ্রহ বেশি এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংস্কৃতিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চান।
এই পরিবর্তন পূর্বের ফ্যাশন প্রবণতার তুলনায় স্পষ্ট। আগে ডিজাইনাররা “গ্রাম্য জীবন” বা “প্রথাগত পোশাক” মতো একক থিম বেছে নিয়ে তা পুনরায় তৈরি করতেন; এখন থিমটি গবেষণার সূচনা বিন্দু এবং মোটিফের গভীর বিশ্লেষণই মূল কাজ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ধরণের পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের গবেষণামূলক দক্ষতা বাড়ায় এবং তাদেরকে বাজারের চাহিদার বাইরে সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করে। ক্লাসে মোটিফের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ও আধুনিক ডিজিটাল টুলের ব্যবহার একসাথে শেখানো হয়, যা তাদেরকে বহুমাত্রিক ডিজাইনারে রূপান্তরিত করে।
ফ্যাশন শিল্পে এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তরুণদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় যে তারা ঐতিহ্যকে আধুনিক রূপে উপস্থাপন করতে পারে। ফলে স্থানীয় হস্তশিল্প, ঐতিহ্যবাহী বুনন ও ঐতিহাসিক প্যাটার্নের পুনর্জীবন ঘটছে, যা দেশের গ্লোবাল ফ্যাশন বাজারে নতুন পরিচয় তৈরি করতে সাহায্য করবে।
শিক্ষা নীতি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সৃজনশীলতা ও গবেষণার সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা থিমের পৃষ্ঠতল ছাড়িয়ে গভীর বিশ্লেষণ করে নকশা তৈরি করতে পারছে, যা শিল্পের ভবিষ্যৎকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
এই তরুণ ডিজাইনারদের কাজের মাধ্যমে দেখা যায়, ফ্যাশন এখন শুধুমাত্র পোশাক নয়, বরং সংস্কৃতির গল্প বলা, পরিচয় গঠন এবং আধুনিক সমাজের চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যম। তাদের উদ্ভাবনী পদ্ধতি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ফ্যাশনকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলাদা করে তুলতে পারে।
প্রতিটি ডিজাইনারের জন্য মোটিফের গবেষণা ও ডিজিটাল টুলের ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীরা এখন ঐতিহ্যবাহী প্যাটার্নকে আধুনিক গ্রাফিক্স, ৩ডি মডেলিং ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত করে নতুন পণ্য তৈরি করছে।
আপনার যদি ফ্যাশন বা ডিজাইন শিক্ষায় আগ্রহ থাকে, তবে মোটিফের ইতিহাস জানার পাশাপাশি ডিজিটাল সফটওয়্যার শিখে নকশায় নতুন দৃষ্টিকোণ যুক্ত করা একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। আপনার পরবর্তী প্রকল্পে ঐতিহ্যবাহী মোটিফকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে মিশিয়ে দেখুন—এটি আপনার সৃজনশীলতা ও বাজারের চাহিদা দুটোই পূরণ করতে পারে।



