বাংলাদেশে ভূগোলিক সূচক (GI) পণ্যের আইনি স্বীকৃতি সম্প্রতি বাড়ছে, যা নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জেলায় উৎপাদিত খাবারের অনন্যতা নিশ্চিত করে। এই ব্যবস্থা কৃষক, মৎস্যকর্মী, কারিগর, মোরি এবং স্থানীয় ব্যবসার জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তবে বাস্তব বাজারে পরিবর্তন এখনও সূক্ষ্ম পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপত আম, রংপুরের হরিভঙ্গা আম এবং নারসিংদির লটকন ফলের উদাহরণে দেখা যায়, প্রতিটি ফলের স্বাদ ও গুণাবলি স্থানীয় মাটির, জলবায়ু ও চাষের পদ্ধতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এই ফলগুলো শুধুমাত্র স্বাদই নয়, অঞ্চলীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও কাজ করে।
ধান ক্ষেত্রের দিক থেকে দেখলে দিনাজপুরের কাতারিভোগ ধান ও শেরপুরের তুলশিমালা ধান জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত হয়েছে। উভয়ই স্থানীয় কৃষকদের ঐতিহ্যবাহী চাষ পদ্ধতি ও মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ফলে উৎপাদনের গুণগত মানে পার্থক্য স্পষ্ট হয়।
নদী ও উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ইলিশ ও বাগদা চিংড়ি জাতীয় পণ্যগুলোও জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। এই দু’টি সামুদ্রিক সম্পদ দেশের রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বাদ ও গুণমানের জন্য চাহিদা বাড়ছে।
মিষ্টি শিল্পে বগুড়ার দই, টাঙ্গাইলের পোরাবারী চামচাম এবং নাটোরের কাঁচাগোল্লা জিআই ট্যাগ পেয়েছে। এই মিষ্টিগুলো ঐতিহ্যবাহী রেসিপি ও স্থানীয় উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি, যা গ্রাহকদের মধ্যে অঞ্চলীয় গর্বের অনুভূতি জাগায়।
এইসব পণ্য একত্রে দেখায় যে খাবার ও স্থানীয় পরিচয়ের মধ্যে কতটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। জিআই লেবেল শুধুমাত্র পণ্যের উৎস নিশ্চিত করে না, বরং ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন পদ্ধতি ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে সুরক্ষিত রাখে।
তবে প্রশ্ন রয়ে যায়, জিআই ট্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ কতটুকু সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে। উৎপাদনকারী ও বিক্রেতাদের জন্য এই স্বীকৃতি কী পরিমাণে বাস্তবিক সুবিধা এনে দিচ্ছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবসা ও মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সলাউদ্দিন পলাশের মতে, জিআই পণ্যের বাজারে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, তত্ত্বগতভাবে জিআই পণ্য অর্থনৈতিক দিক থেকে রূপান্তর ঘটাবে, তবে বাস্তবে পরিবর্তন ধীর ও জটিল।
তাত্ত্বিকভাবে জিআই পণ্য সত্যতা নিশ্চিত করে, মূল্য বৃদ্ধি করে, নতুন ক্রেতা আকর্ষণ করে এবং রপ্তানি বাজারে প্রবেশের দরজা খুলে দেয়। তবে এই সুবিধাগুলো অর্জনে সময়, সঠিক ব্র্যান্ডিং এবং সমন্বিত নীতি প্রয়োজন, যা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
জশোরের ডেট মোলাসেসের উদাহরণে দেখা যায়, যদিও এই শীতের জনপ্রিয় মিষ্টি জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে, তবু এর চাহিদা ও মূল্য বৃদ্ধি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। স্থানীয় উৎপাদকরা এখনও প্রচলিত বিক্রয় চ্যানেল ও সীমিত বাজারে নির্ভরশীল, ফলে রপ্তানি সম্ভাবনা সীমিত রয়ে গেছে।
ভবিষ্যতে জিআই পণ্যের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সমন্বিত মার্কেটিং কৌশল, গুণমান নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি সহায়তা প্রয়োজন। যদি সরকার ও বেসরকারি সংস্থা একসাথে কাজ করে ব্র্যান্ডিং ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নতি করে, তবে জিআই পণ্য দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যথায়, স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও বাজারে স্থবিরতা বজায় থাকবে, যা উৎপাদনকারীদের আয় ও দেশের রপ্তানি আয় উভয়ই সীমাবদ্ধ করবে।



