সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তিনি তেহরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কঠোর সমালোচনার পর সরাসরি ইরানের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের পুনর্গঠন দাবি করেন। এই মন্তব্যগুলো ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং সম্প্রতি বাড়তে থাকা প্রতিবাদ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রকাশ পেয়েছে।
ট্রাম্পের মতে, ইরানে এখন নতুন নেতৃত্বের সন্ধান করা জরুরি, কারণ বর্তমান শাসনব্যবস্থা দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি ইরানের সরকারকে বিক্ষোভ দমন করতে যে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা দেশের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন। এই অবস্থান তার পূর্ববর্তী ইরান‑সংক্রান্ত নীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রেসিডেন্ট ইরানের শীর্ষ নেতা খামেনির নীতি ও কাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাওয়া হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, খামেনি দেশের স্বার্থের পরিবর্তে নিজের ক্ষমতা বজায় রাখতে ভয় ও মৃত্যুর পরিবেশ তৈরি করছেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্যগুলো ইরানের সাম্প্রতিক প্রতিবাদে হাজারো মানুষের প্রাণহানির পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপে বহু নাগরিক নিহত হয়েছেন।
বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, একজন নেতার দায়িত্ব হল জনগণকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা, না যে ভয় বা মৃত্যুর হুমকি দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখা। তিনি যুক্তি দেন, এমন শাসনব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করবে এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন হারাবে। এই বক্তব্য ইরানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
বিবাদের সূচনা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে খামেনির কয়েকটি পোস্টের পর, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সাম্প্রতিক সহিংসতা ও ক্ষয়ক্ষতির সরাসরি দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করেন। খামেনি যুক্তি দেন, ট্রাম্প ইরানি জনগণের নাম ব্যবহার করে সহিংস গোষ্ঠীগুলোকে উস্কানি দিচ্ছেন, যা ইরানি জাতির জন্য চরম অবমাননা। এই অভিযোগের পর ট্রাম্পের মন্তব্য আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের পারমাণবিক সুবিধায় আক্রমণের পর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা শীর্ষে পৌঁছেছে। সেই সময়ে খামেনি এক ভাষণে দাবি করেন, ইরানি জাতি যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করেছে। ট্রাম্পের জবাবে তিনি ইরানের শাসনব্যবস্থাকে স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক হিসেবে বর্ণনা করেন, এবং বলেন যে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে ক্ষমতা বজায় রাখা কোনো নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য নয়।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যগুলো ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিধি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এই স্পষ্ট অবস্থান ইরানের বিরোধী গোষ্ঠীর জন্য সম্ভাব্য সমর্থন সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যদিও কোনো সরাসরি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত এখনো প্রকাশিত হয়নি। তেহরানের সরকার এই মুহূর্তে কোনো তাত্ক্ষণিক মন্তব্য প্রদান করেনি, যা বিষয়টির জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, ট্রাম্পের এই আহ্বান ইরানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে, বিশেষত যখন দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অস্থিরতা তীব্রতর হচ্ছে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি আরও কঠোর হয়, তবে ইরানের বিরোধী দলগুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে বেশি স্বীকৃতি পেতে পারে। তবে একই সঙ্গে, ইরানের শাসক গোষ্ঠী এই ধরনের মন্তব্যকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখবে এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারে।
ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপের পথ পুনরায় খোলার সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও তা কঠিন শর্তের ওপর নির্ভর করবে। পারমাণবিক চুক্তি, মানবাধিকার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনাগুলো পুনরায় শুরু হলে, ট্রাম্পের এই প্রকাশিত অবস্থান আলোচনার টেবিলে প্রভাব ফেলতে পারে। তেহরানের সরকার যদি এই মন্তব্যের প্রতি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না দেয়, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে ইরানের নীতি ও কূটনৈতিক কৌশল পুনর্মূল্যায়নের দরকার হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ট্রাম্পের ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের আহ্বান দেশীয় অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক উত্তেজনা এবং পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন পর্যায়ের সূচনা করতে পারে। এই পরিস্থিতি কিভাবে বিকশিত হবে, তা নির্ভর করবে উভয় পক্ষের কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং ইরানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের উপর।



