ইউরোপের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপকে সতর্কতা সংকেত হিসেবে প্রকাশ করেছেন, যা ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক জোটের ঐক্যকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স ল্যোক্কে রাসমুসেনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসনকে চ্যালেঞ্জ করে, তবে ইউরোপের জন্য ‘লাল রেখা’ অতিক্রম করা হবে না। তিনি ২০২৬ সালকে উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, মানুষকে পণ্য হিসেবে নয়, মানুষকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডের অর্ধ-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলকে ডেনমার্ক থেকে হস্তান্তর বা বিক্রির দাবি করে আসছে, যা ন্যাটোর ইতিহাসে সর্ববৃহৎ সংকটের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ইউরোপীয় নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের ওপর দখল করার চেষ্টা করে, তবে তা ন্যাটো জোটের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইউক্রেনের প্রতি সামরিক সহায়তা বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়েছে, যদিও এই পদক্ষেপের পেছনে রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষা করার ইঙ্গিত রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর আটক ও যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের বিষয়ে ইউরোপীয় নেতাদের কোনো স্পষ্ট মন্তব্য শোনা যায়নি, যা অঞ্চলীয় নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনায় অতিরিক্ত জটিলতা যোগ করেছে। গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইউরোপের কিছু নেতা ট্রাম্পের নীতির প্রতি অতিরিক্ত সমর্থন দেখিয়ে নিজেদেরকে তার অনুগামী হিসেবে উপস্থাপন করছেন। ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে গত জুনের এক সম্মেলনে ট্রাম্পকে ‘ড্যাডি’ বলে সম্বোধন করে উপস্থিত ছিলেন, যা ইউরোপীয় রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যোক্কে রাসমুসেন ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলোচনায় ইউরোপের একটি স্পষ্ট ‘লাল রেখা’ রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, “এটি ২০২৬ সাল, মানুষকে পণ্য হিসেবে বাণিজ্য করা যায়, কিন্তু মানুষকে পণ্য হিসেবে বাণিজ্য করা যায় না।” এই বক্তব্য গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণে ইউরোপের দৃঢ় অবস্থানকে তুলে ধরে।
জার্মান মার্শাল ফান্ডের মার্কিন প্রতিরক্ষা ও ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক নিরাপত্তা বিষয়ক সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টিনে বেরজিনা যুক্তি দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ডের প্রশ্নে ইউরোপ একটি নির্দিষ্ট ‘লাল রেখা’ চিহ্নিত করেছে, যার পক্ষে তারা দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে চায়। তিনি উল্লেখ করেছেন, “অন্যান্য বিষয়েও আলোচনা হতে পারে, তবে গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন আলাদা। ইউরোপকে তার নিজস্ব ভূখণ্ড ও অধিকার রক্ষার সক্ষমতা যাচাই করতে হবে।”
লাটভিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ক্রিশিয়ানিস কারিন্সের মতে, নিরাপত্তা ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে ইউরোপের কূটনৈতিক অবস্থান কিছুটা সীমাবদ্ধ। তিনি বলেছিলেন, “ইউরোপের এমন কোনো অবস্থান নেই যেখানে সে দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করতে পারে।” এই মন্তব্য ইউরোপের নিরাপত্তা নীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা তুলে ধরে।
গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই বিতর্কের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের সীমা পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। যদি যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের ওপর সরাসরি পদক্ষেপ নেয়, তবে ন্যাটো জোটের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে, ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা হ্রাসের হুমকি ইউরোপকে নিরাপত্তা নীতিতে পুনরায় সমন্বয় করতে বাধ্য করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, ইউরোপীয় নেতারা গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে আগ্রহী। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নিরাপত্তা নির্ভরতা ইউরোপকে কূটনৈতিকভাবে ‘বেকায়দা’ অবস্থায় রাখছে, যা ভবিষ্যতে আরও জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের দিকে ইঙ্গিত করে।
গ্রিনল্যান্ডের অধিকার ও স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত এই তীব্র বিতর্কের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে বিষয়টি আলোচনার সূচিতে যুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে, ইউরোপের ‘লাল রেখা’ অতিক্রম না করা এবং ন্যাটো জোটের ঐক্য বজায় রাখার জন্য কঠোর অবস্থান নেওয়া সম্ভবত অব্যাহত থাকবে।



