ঢাকা, আগারগাঁও – গত শনিবার দুপুরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গুম ও নির্যাতনের শিকার পরিবারের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। গুমের শিকারদের আত্মীয়স্বজন, “মায়ের ডাক” ও “আমরা বিএনপির পরিবার” সমন্বয়ে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য ছিল গুমের শিকারদের পরিবারের কষ্ট শেয়ার করা এবং গুমের দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের দাবি তোলা। এ অনুষ্ঠানে গুমের শিকারদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সঙ্গে মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
আদিবা ইসলাম, পারভেজ হোসেনের কন্যা, সমাবেশে তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। পারভেজ হোসেন, যিনি ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকা শহরের শাহবাগ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছিলেন, তখন থেকে নিখোঁজ। আদিবা জানান, তার বাবা হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি মায়ের হাত ধরে বিভিন্ন দপ্তর, থানা ও ক্যাম্পে ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, গুম শব্দটি ছোট হলেও এর পেছনে হাজারো কষ্ট ও কান্না লুকিয়ে আছে।
আদিবার কথায় তিনি একমাত্র স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেন – বাবার সঙ্গে স্কুলে যাওয়া। তবে এখন পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তার কথা শোনার পর মঞ্চে নীরবতা ছড়িয়ে পড়ে, অনেক দর্শক চোখ মুছতে থাকে।
সমাবেশে আরেকজন শিকার পরিবারের সদস্য লামিয়া আক্তারও উপস্থিত ছিলেন। তিনি কাওসার হোসেনের কন্যা, যাকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে নাখালপাড়া থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছিল। লামিয়া বলেন, তিন বছর বয়সে তার বাবা চলে গিয়েছিলেন এবং তখন তিনি বাবার মানে বুঝতে পারতেন না। তিনি যদি জানতেন যে বাবা হারিয়ে যাবে, তবে হয়তো শেষ মুহূর্তে তাকে আলিঙ্গন করে কান্না করতেন। লামিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমি আমার বাবার হাতটা একটু ধরতে চাই।” তার এই আবেগপ্রবণ আবেদন সমাবেশে উপস্থিত সকলকে স্পর্শ করে।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদও মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। আদিবার তারেক রহমানের উদ্দেশ্যে বলেন, “যারা বাবাকে গুম করেছে, তাদের বিচার যেন এই দেশের মাটিতে হয়।” তারেক রহমানের মুখে দৃঢ়তা দেখা যায়; তিনি গুমের শিকারদের পরিবারের দাবিকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, গুমের দায়ী ব্যক্তিদের আইনি পথে আনা উচিত।
গুমের শিকারদের পরিবারগুলো উল্লেখ করে যে, গুমের শব্দটি ছোট হলেও এর পেছনে অসংখ্য পরিবার ভাঙা, সন্তানরা বাবা-মা ছাড়া বড় হওয়া এবং সামাজিক অস্থিরতা রয়েছে। তারা দাবি করে, গুমের মামলাগুলো দ্রুত তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের আদালতে হাজির করা হোক।
অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, গুমের মামলাগুলো বর্তমানে তদন্তাধীন এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা সংস্থার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি।
সমাবেশের শেষে গুমের শিকারদের পরিবারগুলো একত্রে একটি স্মরণীয় শিলালিপি তৈরি করে, যেখানে গুমের শিকারদের নাম ও তাদের পরিবারের কষ্টের সংক্ষিপ্ত বিবরণ রয়েছে। এই শিলালিপি ভবিষ্যতে গুমের শিকারদের স্মরণে একটি স্থায়ী চিহ্ন হিসেবে রক্ষার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
গুমের শিকারদের পরিবার ও মানবাধিকার সংস্থার মতে, গুমের ঘটনা দেশের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তারা দাবি করে, গুমের শিকারদের পরিবারকে যথাযথ সমর্থন ও আইনি সহায়তা প্রদান করা হোক এবং গুমের দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এই সমাবেশ গুমের শিকারদের কণ্ঠস্বরকে একত্রিত করে, তাদের কষ্টকে দৃশ্যমান করে এবং গুমের দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে। গুমের শিকারদের পরিবারগুলো আশা করে, এই ধরনের সমাবেশের মাধ্যমে গুমের সমস্যার সমাধানে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি পাবে।



