ভাসানচর দ্বীপের সীমানা নিয়ে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার মধ্যে চলমান বিরোধের সমাধানের জন্য চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের অধীনে গঠিত কমিটি ৯ মার্চ প্রথম সভা আয়োজন করে। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে, ভাসানচরকে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
১৯৯২ সালে সন্দ্বীপের নয়ামস্তি ইউনিয়ন সাগরে ডুবে যাওয়ার পর, স্থানীয় বাসিন্দারা জানান যে একই স্থানে দ্রুতই নতুন চর গড়ে ওঠে। ঐ চরকে স্থানীয় ভাষায় “ঠ্যাঙ্গারচর” বলা হতো এবং পরবর্তীতে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা পুনর্বাসন আলোচনার সময় “ভাসানচর” নামে পুনঃনামকরণ করা হয়।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সন্দ্বীপের দক্ষিণ উপকূলের কাছাকাছি ১৯৯০‑এর দশকে নতুন ভূমি উদ্ভূত হতে শুরু করে এবং পরবর্তী কয়েক দশকে ঐ এলাকার আয়তন ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসনিক সংস্থার মধ্যে ভূ‑রাজনৈতিক টানাপোড়েন গড়ে ওঠে।
২০১৭ সালে নোয়াখালী জেলার দাইরা জরিপে ভাসানচরকে নোয়াখালী জেলার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে সন্দ্বীপের বাসিন্দা, বিশেষ করে ছাত্র ও পেশাজীবীরা বিরোধের মুখে দাঁড়ায় এবং প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে।
২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ ভাসানচর থানা গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনে ভাসানচরকে হাতিয়া ও নোয়াখালীর অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যা সন্দ্বীপের জনগণের মধ্যে পুনরায় বিক্ষোভের সঞ্চার করে। ছাত্র, শিক্ষক ও অন্যান্য সামাজিক গোষ্ঠী একত্রে প্রতিবাদ রেলি চালায় এবং সরকারি নথিতে পরিবর্তনের দাবি জানায়।
বিরোধের সমাধানের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের অফিসে একটি “চট্টগ্রাম‑নোয়াখালী জেলার সীমানা জটিলতা নিরসন কমিটি” গঠন করা হয়। এই কমিটিতে সন্দ্বীপ ও হাতিয়ার নির্বাহী কর্মকর্তার পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবীর প্রতিনিধিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কমিটির প্রথম সভা ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখা ভাসানচরকে সন্দ্বীপের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করবে এবং তা সংশ্লিষ্ট উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেবে।
সেই একই সময়ে ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির নেতা আবদুল হান্নান মাসউদ ফেসবুকে পোস্ট করে ভাসানচরকে হাতিয়ার অংশ দাবি করেন। পোস্টের পরই হাতিয়া উপজেলা থেকে ভাসানচরকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে হাতিয়া দ্বীপ সমিতির উদ্যোগে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়।
চট্টগ্রামেও হাতিয়া বাসীর পক্ষ থেকে মানববন্ধন গঠন করা হয়, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা ভাসানচরের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে তাদের মত প্রকাশ করেন। এইসব কার্যক্রমের পটভূমিতে ভাসানচরের ভূ‑রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে দুই জেলা ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়।
ভাসানচরের সীমানা বিরোধের সমাধানে গৃহীত পদক্ষেপগুলো এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখা যে প্রতিবেদন জমা দেবে, তা নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সমন্বয় করে চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই সীমানা নির্ধারণের ফলাফল ভবিষ্যতে দু’জেলার মধ্যে সম্পদ ভাগাভাগি, নির্বাচনী এলাকা পুনর্গঠন এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা পুনর্বাসন ও সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণে ভাসানচরের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সর্বশেষে, ভাসানচরকে সন্দ্বীপের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাবটি স্থানীয় জনগণের দাবি, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক স্বার্থের সমন্বয়ে গঠিত একটি জটিল প্রক্রিয়া। কমিটির কাজের অগ্রগতি, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয় এবং উভয় জেলার রাজনৈতিক নেতৃত্বের মনোভাবই শেষ পর্যন্ত এই বিরোধের সমাধান নির্ধারণ করবে।



