শুক্রবার (১৭ জানুয়ারি) ঢাকা শহরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (ব্রেইন) আয়োজন করা ‘আগামী নির্বাচিত সরকার ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে মব ভায়োলেন্স ও পপুলার ফ্যাসিজমের উত্থান নিয়ে তীব্র আলোচনা হয়।
সামিনা লুৎফা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক, মব ভায়োলেন্সকে বর্তমানের অন্যতম বড় সামাজিক সমস্যারূপে চিহ্নিত করেন এবং উল্লেখ করেন যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা এখনো থেমে নেই; বরং সহিংসতার সংস্কৃতি রূপান্তরিত হয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে।
লুৎফা আরও বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সাইবার স্পেসে হুমকির মুখে রয়েছে। ৫ আগস্টের পর নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ফেসবুকে পোস্টগুলোকে ‘অনলি মি’ করে রাখা হচ্ছে, আর জুলাই ২০২৩-এ অংশগ্রহণকারী নারীরা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। তিনি জুলাই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার এবং ভিন্নমতকে সম্মানজনকভাবে গ্রহণ করা নেতৃত্বের আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফিরোজ আহমেদ মব বা দঙ্গলবাজি হালকাভাবে দেখা যাবে না, তা জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের বিজেপি ক্ষমতায় আসার পথে দঙ্গলবাজি ব্যবহার করেছে এবং একই ধরনের কৌশল বাংলাদেশেও প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে মব কোনো রাজনৈতিক দমনমূলক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না হয়।
ফিরোজ আহমেদ interim সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান প্রশাসনকে শিখ হাসিনা ও এরশাদের আমলের মতোই আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হচ্ছে। তিনি চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা, সফটওয়্যার কেনা সহ বড় চুক্তিগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং চাঁদাবাজি নির্মূলে আগামী সরকারকে স্পষ্ট রূপরেখা তৈরির দাবি করেন।
অর্থনীতিবিদ জিয়া হাসান গত দেড় বছরে সংস্কারের নামে গড়ে ওঠা অকর্মণ্য শাসনব্যবস্থা এবং তার ফলে পপুলার ফ্যাসিজমের উত্থানকে বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, শিখ হাসিনার শাসনকালে পুলিশি রাষ্ট্রনির্ভর ‘স্টেট ফ্যাসিজম’ ছিল, আর এখন ফ্যাসিবাদ সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রবেশ করেছে, যা অধিক বিপজ্জনক।
হাসান আরও উল্লেখ করেন, উগ্রতা ও সহিংস ভাষা এখন দেশপ্রেমের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক বিভাজন ও ঘৃণার রাজনীতি অর্থনৈতিক স্থায়িত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দেশের পতনের দিকে ধাবিত করে। তিনি প্রতিহিংসা না করে সত্য ও সমন্বয়ের (ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন) প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পরামর্শ দেন, যাতে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও উন্নয়ন সম্ভব হয়।
বৈঠকের আলোচনায় উল্লেখযোগ্য যে, মব ভায়োলেন্সের সামাজিক প্রভাব এবং পপুলার ফ্যাসিজমের উত্থান দুটোই একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। অংশগ্রহণকারীরা একমত যে, এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে না আসলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া, নাগরিক অধিকার এবং দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ব্রেইন এই ধরনের আলোচনা আয়োজনের মাধ্যমে নীতি নির্ধারক, গবেষক ও নাগরিকদের মধ্যে সংলাপের সুযোগ তৈরি করতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে মব ভায়োলেন্সের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।
বৈঠকের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, অংশগ্রহণকারীরা সরকারকে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং মানবাধিকার রক্ষার দিক থেকে কংক্রিট নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানায়। এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে পপুলার ফ্যাসিজমের বিস্তার রোধে সামাজিক সংহতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।



