নোয়াখালী সাদরে শনিবার সকালবেলায় মাইজদী রেলওয়ে স্টেশন পার্শ্ববর্তী এলাকায় এক ৬০ বছর বয়সী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইব্রাহিম খলিল, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ অধিকারী, জানান, অভিযানে দুইটি সংরক্ষিত প্রজাতির কড়া কাইট্টা কচ্ছপ এবং শিকারের জন্য ব্যবহৃত তিনটি রাকশা, দুটি ড্রাম জব্দ করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি বিকাশ কুমার বড়ুয়া, যাকে কচ্ছপ শিকারের প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অভিযানটি মাইজদী স্টেশন এলাকায় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে চালু হয়। সূত্র অনুযায়ী, স্থানীয় এক চক্র বিভিন্ন জায়গা থেকে কচ্ছপ সংগ্রহ করে প্রতি কেজি এক হাজার থেকে এক হাজার দুইশত টাকা মূল্যে বিক্রি করত। এই তথ্য পাওয়ার পর, ইব্রাহিম খলিল, উপকূলীয় বন বিভাগ এবং সদর রেঞ্জ অফিসার কামরুজ্জামান একত্রে তল্লাশি চালান। তল্লাশির সময়, মাইজদী স্টেশনের পাশে একটি পরিত্যক্ত ঘরে গোপনভাবে সংরক্ষিত কচ্ছপ ও শিকারের সরঞ্জাম পাওয়া যায়।
বিকাশ কুমার বড়ুয়া গ্রেফতারকালে জানান, তিনি ও তার সহকর্মীরা কচ্ছপ চোরাচালানকারীর নেটওয়ার্কের অধীনে কাজ করে। তিনি উল্লেখ করেন, শিকারের পর কচ্ছপকে প্রতি কেজি এক হাজার থেকে এক হাজার দুইশত টাকায় বিক্রি করা হয় এবং রাতের অন্ধকারে ট্রাক ও বাসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পণ্যটি পরিবহন করা হয়। এই ধরনের অবৈধ বাণিজ্য দেশের সংরক্ষিত প্রজাতির সংখ্যা হ্রাসের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অভিযানে জব্দ করা তিনটি রাকশা এবং দুটি ড্রাম শিকারের সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। রাকশা, যা কচ্ছপকে ধরা ও টেনে আনার জন্য ব্যবহার করা হয়, সাধারণত নদী ও পুকুরের আশেপাশে স্থাপন করা হয়। ড্রামগুলো শিকারের সময় কচ্ছপকে সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হতো। এই সরঞ্জামগুলো জব্দের মাধ্যমে শিকারের চক্রটি অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বিকাশ কুমার বড়ুয়া স্বীকার করেন, তিনি একাধিক চোরাচালানকারীর সঙ্গে কাজ করেন এবং শিকারের পর কচ্ছপকে নির্ধারিত দামে বিক্রি করেন। তিনি আরও জানান, শিকারের সময় রাত্রিকালীন গতি বাড়াতে ট্রাক ও বাসের ব্যবহার করা হয়, যা পণ্যকে দ্রুত বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে দেয়। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট হয় যে কচ্ছপ পাচার একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের অংশ, যেখানে পরিবহন, বিক্রয় এবং গোপন সংরক্ষণস্থল একত্রে কাজ করে।
বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিল জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত কেউ আর দায়িত্ব নিতে পারবে না। গ্রেফতারকৃত বিকাশকে সতর্ক করা হয়েছে, যাতে তিনি ও তার সহকর্মীরা এই পেশা ত্যাগ করে বৈধ কাজের দিকে ঝুঁকেন। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদেরও একই রকম সতর্কতা জানানো হয়েছে।
অভিযারে অ্যানিমেল রাইটস বিডি-৬৪ নামের একটি স্থানীয় সংস্থার সহযোগিতা পাওয়া গিয়েছে। এই সংস্থা পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রাণী অধিকার রক্ষায় সক্রিয়ভাবে কাজ করে এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে অবৈধ শিকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়। তাদের অংশগ্রহণে তল্লাশি ও জব্দের কাজ দ্রুত ও সুনির্দিষ্টভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
বিকাশ কুমার বড়ুয়া এখন স্থানীয় আদালতে হাজির হবেন এবং তার বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো মামলার তদন্ত চালিয়ে যাবে, যাতে শিকারের পুরো চক্রটি উন্মোচিত হয় এবং অন্যান্য জড়িত ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনা যায়। এই ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে সংরক্ষিত প্রজাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অবৈধ বাণিজ্য দমন করা সম্ভব হবে।
এই ঘটনার পর, নোয়াখালী জেলার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগ জনসাধারণকে আহ্বান জানিয়েছে, যে কোনো অবৈধ শিকারের তথ্য দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানাতে। তারা উল্লেখ করে, সংরক্ষিত প্রজাতির সুরক্ষা শুধুমাত্র সরকারি তদারকি নয়, সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেও সম্ভব। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে তদারকি বাড়ানো এবং সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা হবে।



