কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার হাওরাঞ্চলে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী চৌদ্দমাদল মেলা এই বছর অনুমতি না পেয়ে অনুষ্ঠিত হতে পারছে না। মেলা সাধারণত মাঘ মাসের চতুর্থ তারিখে শুরু হয়ে চার দিন ধরে চলে, তবে জেলা প্রশাসনের নিরাপত্তা ও নির্বাচনী উদ্বেগের কারণে অনুমোদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ৯৬তম বারের মতো মেলাটি রদ হয়ে গেছে।
চৌদ্দমাদল মেলা হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় রীতি হিসেবে শুরু হলেও, সময়ের সাথে সাথে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মিলনমেলায় রূপ নেয়। মেলায় ১৪টি ঢোল, বাঁশি ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র একসাথে বাজানো হয়, এবং ১৪ জোড়া করতাল একত্রে ধ্বনিত হয়। বাঙালপাড়া ইউনিয়নের খেলার মাঠে এই অনুষ্ঠান সাধারণত অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে নাথমন্দিরের কীর্তনও অনুষ্ঠিত হয়।
মেলাটির মূল আকর্ষণ হল কীর্তন ও চৌদ্দমাদল পূজা, যা মাঘের চতুর্থ তারিখে শুরু হয়ে চার দিন ধরে চলা রীতি অনুসরণ করে। মন্দিরের প্রাঙ্গণে ধর্মীয় গীতের সুরে পরিবেশ গাঢ় হয়, এবং স্থানীয় শিল্পী ও সঙ্গীতশিল্পীরা একত্রে অংশ নেন। এই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানগুলো হাওরাঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অষ্টগ্রাম উপজেলার জেলা প্রশাসক মেহেরপুরের নিরাপত্তা ও নির্বাচনী পরিস্থিতি বিবেচনা করে মেলাটির অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ে নির্বাচনই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে মেলাটির আয়োজন অনুমোদন করা সম্ভব হয়নি। ফলে মেলাটির পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠান বাতিল হলেও, ধর্মীয় রীতি হিসেবে কীর্তন আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিলভিয়া স্নিগ্ধা একই রকম যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের নিকটবর্তী সময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন, তাই মেলাটির অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে ধর্মীয় রীতি পালন করা গুরুত্বপূর্ণ বলে কীর্তন অনুষ্ঠান চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
অনুমতি না পেয়ে মেলাটির বাতিলের খবর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর হতাশা সৃষ্টি করেছে। তারা জানান, চৌদ্দমাদল মেলা শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয়, বরং সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মিলনমেলা হিসেবে পরিচিত। মেলার চার দিনব্যাপী আনন্দময় পরিবেশ পুরো হাওরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, যা এখনো ফিরে আসবে না।
স্থানীয় নেতারা এবং বাসিন্দা গোষ্ঠী এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে প্রস্তুত, তবে নিরাপত্তা ও নির্বাচনী দিক থেকে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট। ভবিষ্যতে নির্বাচনের পর মেলাটির পুনরায় অনুমোদন চাওয়া হতে পারে, তবে তা নিরাপত্তা ব্যবস্থার যথাযথ সমন্বয় ছাড়া সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, নির্বাচনী সময়ে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করা সাধারণত নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে করা হয়। তবে এই ধরনের পদক্ষেপ স্থানীয় সমাবেশের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা সামাজিক সংহতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সরকারকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা উচিত।
মেলা না হওয়ায় হাওরাঞ্চলের সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডার এক বছর ফাঁকা থাকবে, তবে কীর্তন অনুষ্ঠান চালু থাকবে বলে আশা করা যায়। স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে এই ঐতিহ্যবাহী মেলাটির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা।



