বহুল প্রত্যাশিত বলিউডের রামায়ণ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা দায়িত্বে অস্কারপ্রাপ্ত এ আর রহমান আছেন। হ্যান্স জিমার, হলিউডের কিংবদন্তি সুরকার, তার সঙ্গে এই প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন। দুজনই ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও একসাথে কাজ করছেন, যা প্রকল্পের মূল বার্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এ আর রহমানের সঙ্গীত পরিচালনা কাজটি ভারতীয় সংস্কৃতির একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক উদ্যোগের অংশ। রামায়ণ, যা হিন্দু ধর্মের প্রাচীন গ্রন্থ, তার গল্পকে আধুনিক সাউন্ডে উপস্থাপন করা হবে। চলচ্চিত্রের লক্ষ্য দেশীয় ও বৈশ্বিক দর্শকদের কাছে এই মহাকাব্যের নৈতিকতা ও আদর্শ পৌঁছে দেওয়া।
রহমানের শৈশবের শিক্ষা তার সৃষ্টিশীল দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তিনি ব্রাহ্মণ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন, যেখানে রামায়ণ ও মহাভারত নিয়মিত পাঠ করা হতো। এই পরিবেশ তাকে গল্পের নৈতিকতা, আদর্শ এবং মানব চরিত্রের উৎকর্ষ সম্পর্কে গভীর ধারণা দিয়েছে।
সঙ্গীতের ক্ষেত্রে তিনি যে নীতি অনুসরণ করেন, তা হল উৎস নির্বিশেষে স্রোতকে গ্রহণ করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জ্ঞান অমূল্য এবং তা রাজা হোক বা ভিক্ষুক, সবের কাছ থেকে শেখা যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি তার সৃষ্টিতে বৈচিত্র্যময় সুরের মিশ্রণকে সম্ভব করেছে।
রহমানের মতে, রামায়ণ চলচ্চিত্রটি শুধুমাত্র একটি সিনেমা নয়, বরং ভারত থেকে বিশ্বমুখী একটি প্রেমের প্রকল্প। তিনি এটিকে সংস্কৃতির সেতু হিসেবে উপস্থাপন করেন, যেখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসাথে কাজ করে একটি সাধারণ লক্ষ্য অর্জন করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকল্পের আন্তর্জাতিক আকর্ষণ বাড়িয়ে তুলেছে।
হ্যান্স জিমার, যিনি ইহুদি ধর্মের অনুসারী, তার সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্তে ধর্মীয় পার্থক্যকে কোনো বাধা হিসেবে দেখা হয়নি। তিনি এবং রহমানের সহযোগিতা ধর্মীয় সহনশীলতা ও সৃজনশীল সমন্বয়ের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দুজনের সঙ্গীতশৈলীর মিশ্রণ চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রহমানের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। তবে সময়ের সাথে সাথে তিনি বুঝতে পারেন যে অভিজ্ঞ সুরকারদের সঙ্গে সহযোগিতা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই প্রকল্পে জিমারের সঙ্গে কাজ করা তার জন্য একটি উত্তেজনাপূর্ণ এবং চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত।
প্রকল্পের সঙ্গীত দলটি ভারতীয় শাস্ত্রীয় বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে আধুনিক ইলেকট্রনিক সাউন্ডকে মিশ্রিত করার পরিকল্পনা করেছে। এতে তবলা, সিতার, শাঁখের মতো ঐতিহ্যবাহী যন্ত্রের পাশাপাশি সিন্থেসাইজার ও ড্রাম মেশিনের ব্যবহার থাকবে। এই সমন্বয় রামায়ণের কাহিনিকে নতুন রূপে উপস্থাপন করবে।
চলচ্চিত্রের নির্মাণ দল রামায়ণের মূল গল্পের সঙ্গে আধুনিক সামাজিক প্রেক্ষাপটকে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। এতে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধের আধুনিক ব্যাখ্যা অন্তর্ভুক্ত হবে। সঙ্গীতও এই থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গঠন করা হবে, যাতে দর্শকের হৃদয় ও মনের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা যায়।
রহমানের মতে, ধর্মীয় পরিচয় সুরের গুণগত মানকে প্রভাবিত করে না; বরং সৃষ্টিশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধই মূল চালিকাশক্তি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভালো কাজের উৎস যেখান থেকে আসুক না কেন, তা স্বীকৃতি ও সম্মান পাওয়া উচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি চলচ্চিত্রের সঙ্গীত নীতিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
হ্যান্স জিমারও একই দৃষ্টিভঙ্গি ভাগ করে নেন এবং বলেন, সঙ্গীতের ভাষা সবার জন্য সমান। তিনি যুক্ত করেন, বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মের সুর একত্রিত হলে নতুন সৃজনশীল সম্ভাবনা উদ্ভব হয়। দুজনের এই পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতা চলচ্চিত্রের সঙ্গীতকে আন্তর্জাতিক মানের করে তুলবে।
রহমানের শেষ মন্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রকল্পটি তার জন্য একটি নতুন সীমানা অতিক্রমের সুযোগ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রামায়ণের সুরের মাধ্যমে দর্শকরা মানবিক মূল্যবোধের পুনর্নবীকরণ অনুভব করবে এবং ধর্মীয় সহনশীলতার বার্তা ছড়িয়ে পড়বে।



