যুক্তরাজ্য উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে প্রথম পূর্ণ‑আকারের চালকবিহীন হেলিকপ্টার প্রোটিয়াস চালু করেছে। রয়্যাল নেভি শুক্রবার জানিয়েছে, হেলিকপ্টারটি পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে এবং এখন ন্যাটো মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যবহার করা হবে।
প্রোটিয়াসের মোট খরচ প্রায় ছয় কোটি পাউন্ড, যা প্রায় আট কোটি ডলারের সমান। এই বিনিয়োগটি উত্তর আটলান্টিক ও গ্রিনল্যান্ডের পার্শ্ববর্তী জলসীমায় রাশিয়ার জাহাজ ও সাবমেরিনের চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
লিওনার্ডো হেলিকপ্টারসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল কোলম্যানের মতে, এই অটো‑হেলিকপ্টারটি কঠিন সমুদ্রপরিবেশে মানবিক ঝুঁকি ছাড়াই উচ্চ ঝুঁকির মিশন সম্পাদন করতে সক্ষম হবে। তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রোটিয়াসের উপস্থিতি সমুদ্রপথে আকাশসীমার অপারেশনকে এক নতুন স্তরে নিয়ে যাবে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর থেকে ইউরোপের প্রতিরক্ষা নীতি পুনর্গঠন চলছে। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যে অবস্থিত কৌশলগত জলসীমায় রাশিয়ার নৌবাহিনীর কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়েছে।
মস্কো ও বেইজিংকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা নিয়ে রাশিয়া ‘কল্পকাহিনি’ বলে খারিজ করেছে, তবু পশ্চিমা দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়ে সামরিক সক্ষমতা শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের প্রোটিয়াস প্রকল্পকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্রিটিশ নৌবাহিনীর পূর্বে ছোট আকারের নজরদারি ড্রোন ব্যবহার করা হতো, তবে প্রোটিয়াসের আকার ও প্রযুক্তি উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বড়। এটি উন্নত সেন্সর, দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারি এবং স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন সিস্টেম দিয়ে সজ্জিত, যা দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রের ওপরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম।
প্রোটিয়াসের প্রথম উড্ডয়ন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন হয়, এবং পরীক্ষার সময় হেলিকপ্টারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত রুট অনুসরণ করে সমুদ্রের উপরে ডেটা সংগ্রহ করেছে। রয়্যাল নেভি এই ফলাফলকে ভবিষ্যৎ অপারেশনের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রকল্পের আর্থিক দিক থেকে, প্রোটিয়াসের নির্মাণ ও উন্নয়ন খরচ প্রায় ছয় কোটি পাউন্ড, যা যুক্তরাজ্যের সামরিক প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বৃহত্তম একক প্রকল্পের মধ্যে একটি। এই বিনিয়োগের লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ ও আপডেটের মাধ্যমে হেলিকপ্টারকে আধুনিক যুদ্ধের চাহিদা অনুযায়ী মানিয়ে নেওয়া।
প্রোটিয়াসের ব্যবহার ন্যাটো মিত্রদের জন্য সমুদ্র নিরাপত্তা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর আটলান্টিকের কঠিন আবহাওয়া ও অপ্রত্যাশিত তরঙ্গের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা রাশিয়ার সাবমেরিনের অগ্রগতি সনাক্ত করতে সহায়তা করবে।
এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক ও বেসামরিক ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, দূরবর্তী সমুদ্র অঞ্চলে তেল ও গ্যাসের প্ল্যাটফর্মের রক্ষণাবেক্ষণ, জরুরি উদ্ধার মিশন এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণে স্বয়ংক্রিয় হেলিকপ্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রোটিয়াসের সফল উড্ডয়ন যুক্তরাজ্যের সামরিক শিল্পে নতুন উদ্ভাবনের উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি দেশের রোবোটিক্স ও অটোনোমাস সিস্টেমের গবেষণা ও উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে, এবং আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্তরাজ্যের প্রতিযোগিতামূলকতা বাড়াবে।
সামগ্রিকভাবে, প্রোটিয়াসের মোতায়েন উত্তর আটলান্টিকের নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করবে এবং সমুদ্র পর্যবেক্ষণের নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে। রয়্যাল নেভি ভবিষ্যতে এই হেলিকপ্টারকে আরও বিস্তৃত মিশনে ব্যবহার করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যা অঞ্চলের কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য প্রযুক্তিগত স্বায়ত্তশাসন ও সামরিক আধুনিকীকরণে অগ্রগতি অর্জন করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।



