কক্সবাজারের টেকনাফে শনিবার সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে ‘বাংলা চ্যানেল’ পাড়ি দেওয়ার জন্য ৩৫ জন সাঁতারু সমবেত হন, যার মধ্যে দুইজন নারীও ছিলেন। শাহ পরীর দ্বীপের পশ্চিম সমুদ্র সৈকত থেকে সাঁতার শুরু করে, সাঁতারুদের গন্তব্য সেন্ট মার্টিন দ্বীপের উত্তর সৈকত, যা প্রায় ১৬.১ কিলোমিটার দূরে। এই আয়োজনটি শোরোজ অ্যাডভেঞ্চার শিবিরের অংশ হিসেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং ক্রীড়া পরিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়।
ইভেন্টের উদ্বোধনে কক্সবাজার জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা আলাউদ্দীন উপস্থিত ছিলেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত বোট ও উদ্ধারকর্মী ব্যবস্থা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সাঁতারু মানদণ্ড অনুসারে প্রতিটি অংশগ্রহণকারীকে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে, ফলে সাঁতারুদের কোনো ঝুঁকি ছাড়াই চ্যানেল পারাপার সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
প্রতিযোগিতার অন্যতম অভিজ্ঞ সাঁতারু হলেন ঢাকসুরের প্রাক্তন সদস্য সাইফুল ইসলাম রাসেল, যিনি আগে ছয়বার ‘বাংলা চ্যানেল’ পারাপার করেছেন এবং ২০২৩ সালে ৩ ঘণ্টা ৫০ মিনিটে চ্যানেল পাড়ি দিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তিনি এইবারের সাঁতারে আবার প্রথম হতে চাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, যদিও সমুদ্রের অবস্থা কিছুটা প্রতিকূল। তার পূর্ববর্তী সাফল্যের মধ্যে ২০২১ সালে ‘ডাবল ক্রস’ পারাপারও অন্তর্ভুক্ত।
‘কিং অব বাংলা চ্যানেল’ নামে পরিচিত লিপটন সরকার, যিনি মোট ২০ বার চ্যানেল পাড়ি দিয়ে এই শিরোনাম অর্জন করেছেন, তিনি উল্লেখ করেন যে দুইজন নারীসহ মোট ৩৫ জন সাঁতারু অংশ নিয়েছেন এবং সব সাঁতারু আন্তর্জাতিক রীতি মেনে চলেছেন। লিপটন সরকার নিজে পর্যন্ত ১৬ বার এই চ্যানেল পারাপার করেছেন এবং ২০১২ সালে নেদারল্যান্ডের সাঁতারু ভ্যান গুল মিলকো, যিনি ইংলিশ চ্যানেল বিজয়ী, এই চ্যানেলে অংশ নেন। সেই বছর থেকে ‘বাংলা চ্যানেল’ আন্তর্জাতিক ওপেন ওয়াটার লং ডিস্ট্যান্স সুইমিং তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
এই ইভেন্টের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ঢাকা ব্যাংক পিএলসি ও ডাইনামিক ডেন্টিস্ট্রি কাজ করেছে, আর ভিসাথিং, স্টুডিও ঢাকা এবং সরকার এগ্রো ইভেন্ট পার্টনার হিসেবে যুক্ত হয়েছে। সাঁতারুদের মতে, প্রথমবারের পরিকল্পনা কাজী হামিদুল হক, একজন মরহুম স্কুবা ডাইভার ও চিত্রগ্রাহক, ২০০৬ সালের ১৪ জানুয়ারি লিপটন সরকার, ফজলুল কবির সিনা ও সালমান সাঈদের সঙ্গে চ্যানেল পারাপার করেন।
সাঁতারুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাঁতার শুরু হওয়ার আগে সব বোট ও রেসকিউ টিমের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তদুপরি, প্রতিটি সাঁতারুর জন্য পর্যাপ্ত সাপোর্ট স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে, যাতে দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতার চলাকালে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা যায়। এই ব্যবস্থা সাঁতারুদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় এবং চ্যালেঞ্জিং সমুদ্রের ঢেউ মোকাবেলায় সহায়তা করে।
সাঁতারুদের মধ্যে দুইজন নারীও ছিলেন, যারা ঢাকা থেকে এসেছেন এবং প্রথমবারের মতো ‘বাংলা চ্যানেল’ পারাপার করছেন। তাদের অংশগ্রহণ এই ইভেন্টকে লিঙ্গ সমতা ও ক্রীড়া উন্নয়নের দিক থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। নারী সাঁতারুদের এই পদক্ষেপকে ক্রীড়া সম্প্রদায়ের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।
‘বাংলা চ্যানেল’ পাড়ি দেওয়া একটি ঐতিহাসিক ক্রীড়া ইভেন্ট, যা প্রতি বছর কক্সবাজারের টেকনাফে অনুষ্ঠিত হয় এবং এখন পর্যন্ত ১৯ তম বার এই রকমের আয়োজন করা হয়েছে। এই বছরও সাঁতারুদের উচ্ছ্বাস ও প্রস্তুতি স্পষ্ট, এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার যথাযথ পরিকল্পনা ইভেন্টকে সফল করে তুলেছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের আন্তর্জাতিক মানের ওপেন ওয়াটার ইভেন্টের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইভেন্টের সমাপ্তি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের উত্তর সৈকতে হয়, যেখানে অংশগ্রহণকারী সাঁতারুদের স্বাগত জানানো হয় এবং তাদের প্রচেষ্টার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। সকল অংশগ্রহণকারী নিরাপদে ফিরে আসার পর, আয়োজকরা পরবর্তী বছরের পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবে।



