বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জাত্রা নাট্যরূপ, যা একসময় গ্রাম্য মেলা ও খোলা মাঠে প্রাণবন্তভাবে উপস্থাপিত হতো, এখন বিলুপ্তির কিনারায়। গত ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ শিলপকলা একাডেমি এক মাসব্যাপী জাত্রা উৎসবের আয়োজন করে শিল্পীদের সমর্থন ও প্রচার করার চেষ্টা করেছিল, তবে এধরনের উদ্যোগের ঘনত্ব এখনও যথেষ্ট নয়।
জাত্রা শব্দের অর্থ “যাত্রা”, যা শিল্পের চলাচলশীল প্রকৃতিকে যথাযথভাবে বর্ণনা করে। শীতকালে দলগুলো এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ভ্রমণ করে সাময়িক খোলা মঞ্চে পারফরম্যান্স দেয়, যেখানে দর্শকরা প্রায়শই মাঠে বসে শো উপভোগ করে। প্রাথমিক সময়ে নাটকের বিষয়বস্তু মূলত পুরাণ ও ধর্মীয় কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে স্ক্রিপ্টে ধীরে ধীরে সামাজিক সমস্যাবলি, রাজনৈতিক বিরোধ এবং বিদ্রোহের থিম যুক্ত হতে থাকে। এই পরিবর্তন জাত্রাকে কেবল বিনোদনের সীমা ছাড়িয়ে সমাজের প্রতিফলন হিসেবে গড়ে তুলেছিল।
ব্রিটিশ শাসনামলে জাত্রার রাজনৈতিক সূক্ষ্মতা শাসকদের নজরে আসে এবং তারা এটিকে সম্ভাব্য বিপদ হিসেবে গণ্য করে। স্বাধীনতা সংগ্রামের শীর্ষে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে জাত্রা দমিত জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে, যা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের বার্তা বহন করে।
মহিলাদের অংশগ্রহণ জাত্রার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। প্রথমদিকে সমাজের দৃষ্টিতে মহিলাদের মঞ্চে আসা অনুচিত ও অবমাননাকর হিসেবে বিবেচিত হয়, ফলে প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র যৌনকর্মীরা মঞ্চে নামতে সাহস পেত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক স্তরের নারী জাত্রায় অংশ নিতে শুরু করে, যা শিল্পের পরিচয়কে নতুন দিক দেয়।
মধুরিমা গুহা নেয়োগীর “জাত্রপালা” গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, নারীর অংশগ্রহণের সময় তাদের মুখোমুখি হওয়া উপহাস ও বৈষম্য শিল্পের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করেছিল। তবে ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে নারী শিল্পী এখন জাত্রার মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
যাঁরা জাত্রার স্বর্ণযুগের সাক্ষী, তাঁদের স্মৃতি এখনও তীক্ষ্ণ। এক শিল্প সংস্থার সচিব ৪২ বছর ধরে জাত্রার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি উল্লেখ করেন যে, তখন প্রতিটি দল ৭০ থেকে ৮০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত ছিল এবং তারা এক পরিবারের মতো একসঙ্গে বাস করত।
অতীতের আর্থিক দিকও উল্লেখযোগ্য। শীর্ষ অভিনেতারা এক সময় মাসে প্রায় এক লাখ টাকা উপার্জন করতেন এবং প্রতিটি পারফরম্যান্সে উল্লেখযোগ্য আয় উৎপন্ন হতো, যা শিল্পীদের জীবনের মান উন্নত করত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন আয় হ্রাস পেয়েছে।
আজকের জাত্রা শিল্পীরা সীমিত উৎসব ও আর্থিক সহায়তার অভাবে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। নতুন প্রজন্মের তরুণরা ঐতিহ্যবাহী নাট্যরূপে আগ্রহ কমিয়ে দেয়, ফলে শিল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাংস্কৃতিক নীতি নির্ধারক, সরকার ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া জাত্রার পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়। নিয়মিত পারফরম্যান্সের সুযোগ, আর্থিক সহায়তা এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শিল্পীদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে এবং এই প্রাচীন শিল্পকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।



