ইরানের সরকার এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের পর সীমিত মোবাইল নেটওয়ার্ক পুনরায় চালু করেছে, ফলে দেশের ব্যবহারকারীরা টেক্সট বার্তা (এসএমএস) পাঠাতে ও গ্রহণ করতে পারছেন। তবে ফোন কলের সুবিধা এবং ইন্টারনেট সংযোগ এখনও বন্ধ রয়েছে।
গত শুক্রবার থেকে দেশজুড়ে মোবাইল এসএমএস পরিষেবা পুনরায় চালু হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে ফোন কলের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ও ওয়েব সেবা এখনও উপলব্ধ নয়, যা ব্যবহারকারীদের যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা বজায় রেখেছে।
প্রায় বিশ দিনেরও বেশি সময় ধরে ইরানে সরকারবিরোধী প্রতিবাদ চলমান, যা ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বাজারে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ধর্মঘটের আহ্বান থেকে শুরু হয়। এই ধর্মঘট দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং ৩১টি প্রদেশের অধিক শহর ও গ্রামে ব্যাপক বিক্ষোভে রূপ নেয়।
বিক্ষোভের তীব্রতা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দেশের শাসনকালে দেখা সবচেয়ে বড় আন্দোলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকার এই সময়ে পূর্বে কখনো না দেখা মাত্রার প্রতিবাদ ও জনসাধারণের অসন্তোষের মুখোমুখি হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটের পটভূমিতে ইরানের মুদ্রা রিয়েল উল্লেখযোগ্যভাবে অবমূল্যায়িত হয়েছে; এক ডলারের বিপরীতে রিয়েলের হার প্রায় নয় লাখ চৌব্বিশ হাজার পঞ্চান্নে পৌঁছেছে। এই মুদ্রা অবমূল্যায়ন দীর্ঘমেয়াদী মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যের ধারাবাহিক বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত, যা সাধারণ জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে কঠিনতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
মুদ্রার দুরবস্থার ফলে খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান ও চিকিৎসা সেবার দাম দ্রুত বাড়ছে, ফলে গৃহস্থালির ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বহু পরিবার চরম সংকটে পড়েছে। এই আর্থিক চাপই বিক্ষোভের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
বিক্ষোভ দমনের জন্য ইরান সরকার ৭ জানুয়ারি থেকে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর মোতায়েন বাড়ায়। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল প্রতিবাদকারীদের সমন্বয় ও যোগাযোগ সীমিত করা।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ১২,০০০ এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং হাজার হাজার প্রতিবাদকারী গ্রেপ্তার হয়েছে। এই সংখ্যা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির তীব্রতা ও মানবিক ক্ষতির মাত্রা প্রকাশ করে।
বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরগুলোতে রাস্তায় গুলিবিদ্ধের ঘটনা, গৃহবিধ্বংস এবং জনসাধারণের চলাচল সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সরকার এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে।
বৈশ্বিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তবে সরকার এখনও আন্তর্জাতিক মন্তব্যের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখাচ্ছে না। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া এই ঘটনাকে ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করছে।
অবস্থার বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে, ইরানের শাসনকর্তা ও বিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা ও রাজনৈতিক সমঝোতার পথ এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে। সরকার কীভাবে যোগাযোগ পরিষেবা পুনরায় চালু করবে এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার জন্য কী পদক্ষেপ নেবে, তা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইন্টারনেট ও কল পরিষেবার সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধার, পাশাপাশি অর্থনৈতিক নীতি সংশোধন ও মানবিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের মূল চাবিকাঠি হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকার ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট।



