দৈনিক স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম ১৭ জানুয়ারি শনিবার ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত গণমাধ্যম সম্মিলনে সাংবাদিকতার ভূমিকা ও মালিকদের দায়িত্ব নিয়ে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানটি নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদের যৌথ উদ্যোগে সংগঠিত হয়, যেখানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, দায়িত্বশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সমন্বিত আহ্বান জানানো হয়।
আনাম সম্মেলনে পাঁচটি মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন; তৃতীয় বিষয়টি বিশেষভাবে সংবাদপত্রের মালিকদের প্রতি লক্ষ্য করে। তিনি বিনিয়োগকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, যদি মালিকরা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পাদকীয় নীতি প্রভাবিত করেন, তবে জনমত গঠনকারী মিডিয়া কখনোই জনগণের বিশ্বাস অর্জন করতে পারবে না। এই মন্তব্যের পর তিনি মালিকদের জন্য একটি নৈতিক কোডের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন, যাতে সাংবাদিকতা স্বতন্ত্র ও নির্ভীক থাকে।
মাহফুজ আনাম সাংবাদিকতাকে ‘সামাজিক ডাক্তার’ হিসেবে উপমা করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, রোগ নির্ণয়ের জন্য মানুষ ডাক্তারকে দেখায়, তেমনি সমাজের সমস্যার সনাক্তকরণে সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, সাংবাদিকরা রোগীর শারীরিক অবস্থা নয়, সমাজের দুর্বলতা, দুর্নীতি ও নীতিগত ঘাটতি চিহ্নিত করে জনসচেতনতা বাড়ায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি মিডিয়ার কাজকে সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা প্রকাশের মাধ্যমে সমাজের উন্নয়নে সহায়তা করা হিসেবে বর্ণনা করেন।
সম্মেলনে উপস্থিত মালিকদের প্রতিনিধিরা আনামের মন্তব্যের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেন। তারা স্বীকার করেন, মিডিয়ার স্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে আর্থিক স্বার্থের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করা চ্যালেঞ্জিং, তবে তারা ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ গঠনের মাধ্যমে এই ভারসাম্য রক্ষা করতে প্রস্তুত। তবে কিছু মালিকের মুখে উদ্বেগের সুর শোনা যায়, কারণ তারা বাজারের প্রতিযোগিতা ও বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর নির্ভরশীল, যা কখনো কখনো সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
আনাম উল্লেখ করেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিনিয়োগকারী চাকরি সৃষ্টিতে মনোযোগ দেন, আর সাংবাদিকরা ত্রুটি ধরতে এবং সমাধানের পথ সুপারিশ করতে কাজ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি মালিকরা সাংবাদিকতাকে শুধুমাত্র ব্যবসায়িক লাভের হাতিয়ার বানিয়ে নেয়, তবে তা জনমত গঠনে ব্যর্থ হবে এবং মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। এই বক্তব্যের পর তিনি মিডিয়ার জন্য একটি স্বচ্ছ নীতি কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যাতে সাংবাদিকতা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে আনাম ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মিডিয়ার ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও নীতি পরিবর্তনের সময়ে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করবে। মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে একটি নৈতিক মানদণ্ড গড়ে তোলা হলে, মিডিয়া জনসাধারণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারবে এবং রাজনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
এই সম্মেলনটি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আনামের ‘সামাজিক ডাক্তার’ উপমা ও মালিকদের প্রতি আহ্বান মিডিয়া ক্ষেত্রের স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা বৃদ্ধির দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের আলোচনার মাধ্যমে মিডিয়া ও মালিকদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে উঠলে, দেশের গণতন্ত্র ও তথ্য প্রবাহের গুণগত মান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।



