গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের জন্য সরকার ৫% মৌলিক বেতনসহ অতিরিক্ত ৪% বার্ষিক বৃদ্ধি অনুমোদন করেছে, যা মোট ৯% বেতন বৃদ্ধির সমান। এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও শ্রমিক আন্দোলনের চাপ মোকাবেলা করা। গৃহীত নীতি গত বছর থেকে কার্যকর, তবে বাস্তবায়নে বড় ও ছোট কারখানার মধ্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পর গাজীপুর ও সাভারের আশুলিয়ায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শ্রমিকরা বেতন ও কাজের শর্তের দাবিতে প্রতিবাদে নেমে আসে। এই আন্দোলনের ফলস্বরূপ গার্মেন্টস শিল্পের মালিক ও শ্রমিকনেতারা ১৮টি বিষয়ের উপর সমঝোতা করেন। সমঝোতার অংশ হিসেবে ন্যূনতম মজুরি পুনর্মূল্যায়ন ও বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির জন্য শ্রম মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে।
কমিটি পাঁচটি সেশন শেষে ৫% মৌলিক বেতনের সঙ্গে অতিরিক্ত ৪% বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের সিদ্ধান্ত নেয়। এই অতিরিক্ত বৃদ্ধি মজুরি পুনর্মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে বড় গার্মেন্টস কারখানাগুলো গত বছর মোট ৯% বেতন বৃদ্ধি প্রদান করেছে।
অন্যদিকে, মাঝারি ও ছোট আকারের, বিশেষত সাবকন্ট্রাক্টিং ভিত্তিক কারখানাগুলো এই বেতন বৃদ্ধি প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছে। শ্রমিকনেতারা জানাচ্ছেন যে, কমপ্লায়েন্ট ও উন্নত কর্মপরিবেশ বজায় রাখা কারখানাগুলোই এই ৯% ইনক্রিমেন্ট দিচ্ছে, আর অন্যদের অজুহাতের পেছনে তদারকি না থাকায় বেতন বৃদ্ধি না দেওয়া হচ্ছে।
মালিকদের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান বছর অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট প্রদান করা হবে কি না তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। সরকার থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা না পাওয়ায় কিছু প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় রয়েছে। এই অনিশ্চয়তা শ্রমিকদের আস্থা হ্রাসের পাশাপাশি উৎপাদন খরচের পূর্বাভাসকে জটিল করে তুলছে।
বৃহৎ কারখানাগুলো যেখানে ৯% বেতন বৃদ্ধি হয়েছে, সেখানে শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা বাড়েছে এবং স্থানীয় বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই বৃদ্ধি উৎপাদন খরচে সরাসরি প্রভাব ফেলছে, যা রপ্তানি মূল্যে প্রতিফলিত হতে পারে। রপ্তানি-নির্ভর গার্মেন্টস সেক্টরে অতিরিক্ত ব্যয় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মূল্য সংবেদনশীলতা বাড়াতে পারে।
ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো যেখানে বেতন বৃদ্ধি প্রয়োগ হয়নি, সেখানে শ্রমিকদের অসন্তোষ বাড়ছে। তদারকি ও আইন প্রয়োগের ঘাটতি এই গোষ্ঠীর মধ্যে শ্রমিক বিরোধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদি এই সমস্যার সমাধান না হয়, তবে উৎপাদন বন্ধ, কাজের সময় কমে যাওয়া এবং অর্ডার বাতিলের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।
বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, বেতন বৃদ্ধি এবং তদারকি ঘাটতি একসঙ্গে গার্মেন্টস শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। উচ্চ ব্যয় এবং শ্রমিক বিরোধের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, যা রপ্তানি আয় হ্রাসের দিকে নিয়ে যাবে।
অন্যদিকে, সরকার যদি স্পষ্ট নীতি ও তদারকি ব্যবস্থা চালু করে, তবে বড় কারখানার ইতিবাচক অভিজ্ঞতা ছোট শিল্পেও বিস্তৃত হতে পারে। সমন্বিত ন্যূনতম মজুরি পুনর্মূল্যায়ন এবং সময়মতো ইনক্রিমেন্ট প্রদান শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
বর্তমানে, শ্রমিকনেতারা আইনগত পদক্ষেপের জন্য সরকারকে আহ্বান জানিয়ে চলেছেন, বিশেষত যারা ৯% ইনক্রিমেন্ট দিচ্ছেন না এমন মালিকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে। এই দাবি শিল্পের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, যদি সরকার স্পষ্ট নির্দেশনা না দেয়, তবে গার্মেন্টস সেক্টরে বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়বে। বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা ও শ্রম নীতি অনুসরণকে অগ্রাধিকার দেবে। তাই, নীতিগত স্পষ্টতা ও তদারকি শক্তিশালী করা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।
সংক্ষেপে, ৯% বেতন বৃদ্ধি বড় কারখানায় কার্যকর হলেও ছোট ও মাঝারি শিল্পে তা না হওয়ায় শ্রমিক বিরোধের ঝুঁকি বাড়ছে। সরকার ও শিল্প সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া গার্মেন্টস শিল্পের রপ্তানি সক্ষমতা ও বাজার অবস্থান হ্রাস পেতে পারে। ভবিষ্যতে ন্যূনতম মজুরি পুনর্মূল্যায়ন এবং ইনক্রিমেন্টের সময়মতো বাস্তবায়নই শিল্পের টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হবে।



