যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন ভিসা প্রক্রিয়ায় ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য নতুন স্থগিতাদেশ কার্যকর হওয়ায় বাংলাদেশি পরিবারগুলোকে অপ্রত্যাশিত অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত তার স্ত্রী ও দুই কন্যার সঙ্গে পুনর্মিলনের জন্য আবেদন করা ৫১ বছর বয়সী তামিম হোসেনের কেস এই নীতির সরাসরি প্রভাবকে উদাহরণস্বরূপ তুলে ধরে।
তামিমের আবেদন প্রক্রিয়া ফেব্রুয়ারি মাসে সাক্ষাৎকারের জন্য নির্ধারিত ছিল, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ৭৫টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্রেশন ভিসা ইস্যু করা বন্ধ করার সিদ্ধান্তের পর তার পুনর্মিলনের সম্ভাবনা হঠাৎই ঝাপসা হয়ে যায়। তামিমের স্ত্রী নিউ ইয়র্কে কলেজের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত, আর বড় কন্যা ১৯ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও পার্ট-টাইম কাজ করছেন। পরিবারটি যুক্তরাষ্ট্রে ট্যাক্স প্রদান করে এবং কোনো সামাজিক কল্যাণের ওপর নির্ভরশীল নয়, তাই তামিমের মতে তিনি মূলত সন্তানদের শিক্ষার খরচ মেটাতে অর্থ পাঠাচ্ছেন।
তামিম ইতিমধ্যে তার সম্পদ বিক্রি করে এবং চাকরি ছাড়ার পরিকল্পনা করেছেন, কারণ তার শ্বশুরের স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া দরকার। বড় কন্যা অন্য রাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েও নিউ ইয়র্কে থাকতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাতে তিনি বাবা-দাদার কাছাকাছি থাকতে পারেন। তামিম এই পরিস্থিতি “পরিবারিক পুনর্মিলনের ক্ষতি” হিসেবে বর্ণনা করে তার হতাশা প্রকাশ করেছেন।
তামিমের কেসের মতোই, শত শত হাজার বাংলাদেশি এবং অন্যান্য দেশের নাগরিক ইতিমধ্যে ইমিগ্রেশন ভিসার জন্য আবেদন করে অপেক্ষা করছেন, কিন্তু এখন তারা সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন নীতি, যা ঐতিহাসিকভাবে অভিবাসী ও তাদের সন্তানদের স্বাগত জানায়, এখন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে লক্ষ্য করে কঠোর শর্ত আরোপ করছে।
রাষ্ট্রবিভাগের ১৪ জানুয়ারি প্রকাশিত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে অভিবাসীদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে হবে এবং তারা আমেরিকান নাগরিকদের উপর আর্থিক বোঝা না হয়ে দাঁড়াবে। এই নীতি অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সামাজিক কল্যাণের ওপর নির্ভরশীলতা রোধের জন্য সকল প্রাসঙ্গিক নীতি, নিয়মাবলী ও নির্দেশিকা পুনর্বিবেচনা করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপটি “জনসাধারণের চার্জ” নীতির সম্প্রসারণের অংশ, যা পূর্বে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়ায় প্রয়োগ করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. রাহুল চৌধুরী উল্লেখ করেন, “যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোরতা মূলত অভিবাসন প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের প্রতিক্রিয়া, তবে এটি বহু পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করে এবং মানবিক দিক থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করে।”
প্রভাবিত দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য আবেদন ও সাক্ষাৎকারের সুযোগ এখনও বজায় থাকবে, তবে সাক্ষাৎকারের পরবর্তী প্রক্রিয়া ও ভিসা ইস্যুতে বিলম্বের সম্ভাবনা বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের কনসুলেটগুলো এখনো নির্ধারিত সময়সূচি অনুসারে সাক্ষাৎকার নির্ধারণ করছে, তবে অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে দেরি হতে পারে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নীতির প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে প্রভাবিত নাগরিকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা চাওয়ার ইচ্ছা জানিয়েছে। একই সঙ্গে, পরিবারগুলোকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা প্রদান করার জন্য স্থানীয় সংস্থাগুলোও ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইমিগ্রেশন নীতির পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি পরিবর্তন কেবলমাত্র ভিসা আবেদনকারীদের নয়, গন্তব্য দেশের শ্রমবাজার, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলবে। ভবিষ্যতে কী ধরণের নীতি সমন্বয় হবে এবং কোন সময়সীমার মধ্যে নতুন নির্দেশিকা প্রকাশিত হবে, তা এখনও অনিশ্চিত, তবে তামিমের মতো বহু পরিবার এই অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গড়ে তুলতে বাধাপ্রাপ্ত।
সংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন ভিসা স্থগিতাদেশের ফলে বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিবারিক পুনর্মিলন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়েছে, আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে এই নীতি মানবিক ও কূটনৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করছে।



