কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি শুক্রবার চীন সঙ্গে একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন, যার মাধ্যমে কানাডা ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে আরোপিত চীনা ইলেকট্রিক গাড়ির শুল্ক হ্রাস করবে এবং বদলে চীন কানাডার মূল কৃষি পণ্যের উপর আরোপিত প্রতিদান শুল্ক কমাবে। এই পদক্ষেপটি কানাডার বিদেশ নীতির নতুন দিক নির্দেশ করে, যেখানে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে স্বতন্ত্রভাবে স্বার্থপরায়ণতা বজায় রাখতে চায়।
চুক্তির মূল শর্তে কানাডা চীনের ইলেকট্রিক গাড়ির ওপর আরোপিত শুল্ক ধীরে ধীরে কমাবে, যা পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ২০২৪ সালে আরোপিত হয়েছিল। পরিবর্তে চীন কানাডার ক্যানোলা তেল, গম এবং অন্যান্য কৃষি পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা কানাডার কৃষক ও রপ্তানি শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি প্রদান করবে।
বাণিজ্য নীতি বিশেষজ্ঞ এরিক মিলার, যিনি রাইডো পোটোম্যাক স্ট্র্যাটেজি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, মন্তব্যে উল্লেখ করেন যে এই চুক্তি কানাডার চীন নীতি পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট সংকেত। তিনি বলেন, কানাডা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একমত না হয়ে নিজের স্বার্থে পদক্ষেপ নিতে ইচ্ছুক, যা দেশের বাণিজ্যিক স্বায়ত্তশাসনকে শক্তিশালী করবে।
প্রধানমন্ত্রী কার্নি শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং চীনের সঙ্গে অর্জিত অগ্রগতি কানাডাকে নতুন আন্তর্জাতিক কাঠামোতে শক্তিশালী অবস্থানে রাখবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প শাসনামলে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের তুলনায় চীন সঙ্গে সম্পর্ককে আরও পূর্বাভাসযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। একই সময়ে তিনি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে জানান, কানাডা চীন সঙ্গে তার সম্পর্ককে কৌশলগত, বাস্তববাদী এবং দৃঢ়ভাবে পুনর্নির্ধারণ করছে।
চুক্তির ঘোষণার পর কানাডার বিভিন্ন রাজ্যের নেতাদের প্রতিক্রিয়া তীব্রভাবে প্রকাশ পায়। সাস্কাচেওয়ান প্রিমিয়ার স্কট মো, যwhose রাজ্যে চীনের ক্যানোলা তেলের ওপর আরোপিত শুল্কের ফলে কৃষকরা বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন, চুক্তিটিকে “খুবই ভাল সংবাদ” বলে স্বাগত জানিয়ে উল্লেখ করেন যে এটি কৃষকদের জন্য জরুরি আর্থিক স্বস্তি এনে দেবে।
অন্যদিকে অন্টারিও প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড, যwhose রাজ্যে কানাডার গাড়ি শিল্পের বড় অংশ অবস্থিত, চুক্তির প্রতি তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, চীনের ইলেকট্রিক গাড়ির শুল্ক হ্রাস কানাডার গাড়ি শিল্পের জন্য ক্ষতিকর হবে এবং কর্মসংস্থান হ্রাসের দিকে নিয়ে যাবে। ফোর্ড টুইটারে উল্লেখ করেন যে বর্তমান সরকার চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, এই চুক্তি কানাডার বাণিজ্য নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি নতুন পর্যায়ের সূচনা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনার অগ্রগতি যদি ধীর হয়, তবে কানাডা চীনকে বিকল্প বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে ব্যবহার করে তার অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। তবে একই সঙ্গে, চীন সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমঝোতার নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর কানাডার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে শুল্ক হ্রাসের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প ও কৃষক সমিতিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে শুল্ক হ্রাসের সময়সূচি নির্ধারণের কাজ শুরু করেছে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে, কানাডা-চীন বাণিজ্য পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রত্যাশিত, বিশেষ করে ইলেকট্রিক গাড়ি ও কৃষি পণ্যের ক্ষেত্রে।
সামগ্রিকভাবে, কানাডার চীন সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি দেশের বাণিজ্যিক স্বায়ত্তশাসনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যিক অমিলের প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত বিকল্প প্রদান করে। ভবিষ্যতে এই চুক্তি কীভাবে কানাডার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করবে, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করা হবে।



