যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণে বিরোধিতা করা দেশগুলোর বিরুদ্ধে নতুন শুল্ক আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশ ইতিমধ্যে ট্রাম্পের এই পরিকল্পনাকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এই উদ্যোগের বৈধতা ও নিরাপত্তা দিক নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের সময় একটি দ্বিপাক্ষিক কংগ্রেসনাল প্রতিনিধি দল গ্রিনল্যান্ডে সফর করছিল। ১১ সদস্যের এই দলটিতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় পার্টির সদস্য অন্তর্ভুক্ত, যারা গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব ও অধিগ্রহণের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েছিল।
দলটি গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্টের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দেশের রাজনৈতিক অবস্থান ও নিরাপত্তা উদ্বেগ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছে। এরপর তারা ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী যেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেনের সঙ্গে বৈঠক করে, যেখানে ট্রাম্পের পরিকল্পনা সম্পর্কে তাদের মতামত শোনা যায়।
মেটে ফ্রেডেরিকসেন গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন ও ডেনমার্কের ভূখণ্ডিক অখণ্ডতার পক্ষে জোর দিয়ে বলেন যে কোনো একতরফা অধিগ্রহণ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে। নিলসেনও একই রকম অবস্থান নিয়ে বলেন যে গ্রিনল্যান্ডের স্বতন্ত্রতা রক্ষা করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।
ট্রাম্পের পূর্বে প্রকাশিত বক্তব্যে তিনি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন এবং দেশটি “সহজ অথবা কঠিন যেকোনো উপায়ে” দখল করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের কথা তুলে ধরে বলেন যে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিকের মাঝামাঝি হওয়ায় তা ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা ও সামুদ্রিক নজরদারির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও তার প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধি রয়েছে; তেল, গ্যাস ও বিরল ধাতু সহ বিভিন্ন খনিজের সম্ভাবনা দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এই সম্পদগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে যুক্ত করে ট্রাম্পের অধিগ্রহণের ইচ্ছা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই পরিকল্পনা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। ডেনমার্কের সরকার গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসনকে সম্মান করার আহ্বান জানায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি মোকাবেলায় কূটনৈতিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি ঘোষণা করে। অন্যান্য ইউরোপীয় দেশও একই রকম অবস্থান গ্রহণ করে, যেখানে তারা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের অধিকার রক্ষার পক্ষে সুর তুলে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যরাও ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা উল্লেখ করেন যে জাতীয় নিরাপত্তার নামে কোনো বিদেশি ভূখণ্ড দখল করা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তা কৌশলকে দুর্বল করতে পারে। কিছু সদস্য শুল্কের হুমকি ব্যবহার করে ট্রাম্পের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করার ইঙ্গিত দেন।
এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের দুই পার্টির প্রতিনিধিরা গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব স্বীকার করলেও অধিগ্রহণের পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক আইনের সম্মান বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্য উপায় অনুসন্ধানের পরামর্শ দেয়, যেমন দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তি ও যৌথ সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থা।
ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। যদি যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের বিরোধী দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ করে, তবে ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়বে। বিশেষত ডেনমার্কের শক্তি ও পরিবহন সেক্টরে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের প্রভাব বড় হতে পারে, যা উভয় পক্ষের অর্থনৈতিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। তারা আরও উল্লেখ করেন যে গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও আইনি অনুমোদন প্রাপ্তি কঠিন, এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই বিষয়ে সমর্থন সীমিত।
পরবর্তী সময়ে কংগ্রেসের আলোচনায় শুল্কের প্রস্তাবের বাস্তবায়নযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করা হবে। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সরকারগুলো কূটনৈতিক চ্যানেল দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে তারা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাদের অধিকার রক্ষার জন্য আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রেখেছে।
এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক নীতি, আন্তর্জাতিক আইন ও কৌশলগত স্বার্থের মধ্যে জটিল সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখল পরিকল্পনা এবং শুল্ক হুমকি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপীয় সম্পর্কের গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



