১৬ জানুয়ারি শুক্রবার আন্তর্জাতিক ন্যায়ালয়ে (আইসিজে) গাম্বিয়া রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সরকার তার অবস্থান তুলে ধরেছে। মিয়ানমার প্রতিনিধিত্বকারী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কো কো হ্লাইং আদালতে জানিয়েছেন যে গাম্বিয়া মামলাটি প্রমাণভিত্তিক নয় এবং তাই তা প্রত্যাখ্যান করা উচিত।
২০১৭ সালে মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনীর আক্রমণের ফলে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা তাদের বাড়ি ছেড়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এই শরণার্থীরা গৃহহত্যা, গণধর্ষণ এবং অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়। জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত মিশন পরবর্তীতে এই ঘটনাগুলোকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
গাম্বিয়া, পশ্চিম আফ্রিকার একটি দেশ, ২০১৯ সালে আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার অভিযোগ নিয়ে মামলা দায়ের করে। গাম্বিয়ার আইনজীবীরা যুক্তি দেন যে রোহিঙ্গাদের উপর করা আক্রমণ, গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া এবং নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা, শুধুমাত্র সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
শুনানির সময় কো কো হ্লাইং উল্লেখ করেন যে মিয়ানমার সরকার ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে আনা এবং পুনর্বাসনের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করেছে। তবে কোভিড-১৯ মহামারি, ঘূর্ণিঝড় এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই উদ্যোগগুলো বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে মিয়ানমার কোনো গোষ্ঠীকে নির্মূল বা জোরপূর্বক বিতাড়িত করার ইচ্ছা নেই।
গাম্বিয়ার আইনজীবীরা এই ব্যাখ্যাকে অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর করা আক্রমণকে গণহত্যার আইনি মানদণ্ডে ফিট করে দেখেন। তারা উল্লেখ করেন যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ হাজার হাজার নিরস্ত্র রোহিঙ্গা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
মিয়ানমার মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত মিশনের ফলাফল নিরপেক্ষ নয় এবং তা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। তিনি দাবি করেন যে মিশনের তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে। এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিয়ানমার সরকারের অবস্থানকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আইসিজেতে এই মামলার শোনানি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। রোহিঙ্গা সংকটের পূর্ববর্তী আইনি পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) মিয়ানমারকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করার প্রচেষ্টা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে আইসিসি এখনও চূড়ান্ত রায় দেয়নি।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে আইসিজের রায় রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদি আদালত গাম্বিয়ার অভিযোগকে প্রমাণিত বলে স্বীকার করে, তবে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করা হতে পারে, যার মধ্যে ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং নিরাপত্তা গ্যারান্টি অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে, মিয়ানমার যদি মামলাটিকে অপ্রমাণিত বলে রায় পায়, তবে তা দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে কিছুটা স্বস্তি দেবে, তবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক অবস্থা ও পুনর্বাসন প্রশ্ন রয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ ও স্বেচ্ছাসেবী পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রণয়নে চাপ দিচ্ছে।
আঞ্চলিকভাবে, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। শরণার্থীদের ফেরত দেওয়া এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়া দু’দেশের কূটনৈতিক সংলাপের একটি সংবেদনশীল বিষয়। গাম্বিয়ার মামলায় রায়ের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা কীভাবে এগোবে, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে থাকবে।
আইসিজের শোনানির পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে রায়ের প্রকাশের সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে। রায়ের পর মিয়ানমারকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার নীতি ও কার্যক্রম সংশোধন করতে হবে, অথবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণ ও সহায়তা গ্রহণ করতে হবে। এই প্রক্রিয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সারসংক্ষেপে, গাম্বিয়া রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগে আইসিজেতে মামলা দায়ের করেছে, তবে মিয়ানমার সরকার আদালতে তার অপ্রমাণিততা তুলে ধরেছে। শোনানির ফলাফল আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মধ্যে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানকে নতুন দিক দিতে পারে, এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর অব্যাহত থাকবে।



