নতুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ভারত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে রণধীর জয়সোয়াল স্পষ্ট করে জানান, ভারতের হাইকমিশনের কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে মিটিং করেন এবং জামায়াত‑ই‑ইসলামির আমিরের সঙ্গে যোগাযোগকেও একই প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা উচিত।
ব্রিফিংয়ের সময় একজন সাংবাদিক জয়সোয়ালকে জিজ্ঞেস করেন, জামায়াত‑ই‑ইসলামির বর্তমান আমির শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎ সম্পর্কে, যিনি গত বছর বায়াপাস শল্যচিকিৎসার পর একটি ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে দেখা করেছেন। সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে জয়সোয়াল বলেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে এবং আমাদের হাইকমিশনের কর্মকর্তারা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করেন। আপনি যে ব্যক্তিদের উল্লেখ করেছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি ঐ প্রেক্ষাপটে দেখা উচিত।”
শফিকুর রহমানের এই সাক্ষাৎ সম্পর্কে প্রথমবারের মতো প্রকাশ পায় ৩১ ডিসেম্বর, যখন তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে একটি সাক্ষাৎকারে জানান, শল্যচিকিৎসার পর তিনি একটি ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেন। সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, বৈঠকটি গোপন রাখতে কূটনীতিকের অনুরোধ ছিল এবং তিনি তা মেনে চলেছেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে বোঝা যায়, ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্তরে যোগাযোগের প্রচেষ্টা ছিল, যা সরকারী স্তরে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি নয়।
জয়সোয়াল এই বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, হাইকমিশনের কর্মকর্তারা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যের বিভিন্ন স্তরে সংলাপ বজায় রাখেন, যাতে পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়গুলো সমাধান করা যায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “যে কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায় না; সবকিছুই বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অংশ।” এভাবে তিনি ভারত-বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের ভিত্তিতে বর্তমান কূটনৈতিক কার্যক্রমকে ব্যাখ্যা করেন।
শফিকুর রহমানের সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, এই ধরনের গোপনীয় বৈঠক ভবিষ্যতে দুই দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে নতুন আলোচনার দিক উন্মোচন করতে পারে। বিশেষ করে, জামায়াত‑ই‑ইসলামির মত ধর্মীয়-রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে ভারত তার নিরাপত্তা, সীমানা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সমন্বয় বাড়াতে চাইতে পারে। তবে একই সঙ্গে, এই ধরনের গোপনীয়তা দেশীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রশ্ন তুলতে পারে, যে কি এই সংলাপগুলো স্বচ্ছতা বজায় রেখে পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, ইতিমধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। তারা জোর দিয়ে বলছে, কোনো বিদেশি গোষ্ঠীর সঙ্গে গোপনীয় সংলাপের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনে প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, ভারতীয় কূটনীতিকের গোপনীয়তা বজায় রাখার অনুরোধকে কিছু বিশ্লেষক কূটনৈতিক গোপনীয়তার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখছেন, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়।
ভবিষ্যতে, ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিথস্ক্রিয়া কীভাবে এগোবে তা নির্ভর করবে উভয় দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইচ্ছা ও জনমতকে কতটা গুরুত্ব দেবে তার ওপর। যদি এই ধরনের গোপনীয় বৈঠক নিয়মিতভাবে চালু থাকে, তবে তা দুই দেশের কূটনৈতিক নীতি ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশে এই সংলাপের স্বচ্ছতা ও জনসাধারণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা হবে কিনা, তা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিধিকে প্রভাবিত করবে।
সারসংক্ষেপে, রণধীর জয়সোয়ালের বক্তব্য এবং শফিকুর রহমানের গোপনীয় বৈঠকের তথ্য একসাথে ইঙ্গিত করে যে, ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে সংলাপকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবে এই সংলাপের স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দেশীয় আলোচনার দরজা খুলে গেছে। ভবিষ্যতে এই বিষয়টি কীভাবে বিকশিত হবে, তা উভয় দেশের কূটনৈতিক কৌশল ও জনমতকে নির্ধারণ করবে।



