ইরানের শেষ শাহী পরিবারে জন্ম নেওয়া রেজা পাহলভি, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের সরকার পতনের জন্য আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন পেলে প্রতিবাদকারীরা বিপ্লবী গার্ডের ওপর সরাসরি আক্রমণ চালাতে পারবে, যা সরকারী দমনকে দুর্বল করবে।
পাহলভি বলেন, ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অবসান অবশ্যম্ভাবী এবং গার্ডের লক্ষ্যবস্তু আক্রমণ সরকারকে আরও সহজে পরাজিত করতে সহায়তা করবে। তিনি নিজের প্রত্যাবর্তন ও সংবিধানিক সংস্কারের পরিকল্পনা উল্লেখ করে ইরানীয় জনগণকে স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রতিবাদে অংশ নেওয়া মানুষদের সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি জোর দেন, গার্ডের ওপর আক্রমণ না হলে দমনের পরিসর বাড়বে এবং আরও প্রাণহানি ঘটবে। তার মতে, নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি হামলা চালাতে চায় না, বরং গার্ডকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে।
ইরানে ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভের পর থেকে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবাদগুলো সহিংস রূপ ধারণ করে, এবং গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রেজা পাহলভির আহ্বানে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে গিয়েছিল। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপে প্রতিবাদকারীরা বড় আঘাত পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুসারে, এই আন্দোলনে দুই হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছেন। ইরান সরকার দাবি করে যে, এই হত্যাকাণ্ডগুলো শত্রুদের প্ররোচনায় দাঙ্গাবাজদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। একই সঙ্গে, ইন্টারনেটের ব্যাপক বন্ধের ফলে সঠিক ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা নির্ধারণে অসুবিধা দেখা দিচ্ছে।
পাহলভি যুক্তরাষ্ট্রকে গার্ডের ওপর ‘সার্জিক্যাল’ আক্রমণ চালানোর জন্য অনুরোধ করেন, যা তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে দ্রুত সমাধানের পথ হিসেবে দেখেন। তিনি যুক্তি দেন, যদি গার্ডের ক্ষমতা হ্রাস পায়, তবে সরকারী কাঠামো দুর্বল হয়ে যাবে এবং জনগণের স্বায়ত্তশাসন সহজে অর্জিত হবে।
ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর দৃষ্টিকোণ থেকে, গার্ড দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়। তারা গার্ডের ওপর আক্রমণকে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখছে এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপকে অগ্রাহ্য করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
বিপ্লবী গার্ডের নেতৃত্বে থাকা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রেজা পাহলভির দাবিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে, বিদেশি হস্তক্ষেপের কোনো স্থান নেই বলে জোর দিয়েছেন। তারা যুক্তি দেন, গার্ডের অস্ত্রশক্তি ও প্রশিক্ষণ দেশের নিরাপত্তা বজায় রাখতে অপরিহার্য।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত রয়ে গেছে। রেজা পাহলভি ইরানের নতুন নেতৃত্বের নির্বাচনকে জনগণের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে, নিজে কোনো ক্ষমতা দাবি না করে কেবল সমর্থন প্রদান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এখন ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকটের দিকে নজর দিয়েছে। কিছু দেশ মানবাধিকার রক্ষার জন্য নরম দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে, অন্যদিকে কিছু দেশ নিরাপত্তা গ্যারান্টি বজায় রাখতে গার্ডের ভূমিকা স্বীকার করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
অবশেষে, রেজা পাহলভির আহ্বান ও গার্ডের ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা ইরানের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন উত্তেজনা যোগ করেছে। গার্ডের শক্তি হ্রাস পেলে সরকার পতনের সম্ভাবনা বাড়বে, আর গার্ডের শক্তি বজায় থাকলে বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে। ভবিষ্যতে কী হবে তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ও ইরানীয় জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ওপর।
এই ঘটনাগুলো ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো, নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের সীমা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। গার্ডের ওপর আক্রমণ বাস্তবায়িত হলে তা দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ত্বরান্বিত করতে পারে, অন্যথায় বর্তমান শাসনব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে।



