জার্মানির শ্লেসভিগ-হোলস্টেইন রাজ্যের আর্কাইভে সংরক্ষিত দুইটি ছোট টুকরা, যা ১৯৪১ সালে নাজি শাসনের সময় জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল শ্লাবো দ্বারা চুরি করা হয়েছিল, গত বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের বায়েউ শহরের মেয়রকে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই পদক্ষেপটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লুট করা সাংস্কৃতিক সম্পদের পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শ্লেসভিগ-হোলস্টেইন আর্কাইভের ইতিহাসবিদরা ২০২৩ সালে শ্লাবোর টেক্সটাইল সংগ্রহের তালিকা পর্যালোচনা করার সময় একটি কাঁচের প্লেটের মধ্যে ছোট কাপড়ের টুকরা আবিষ্কার করেন। ঐ টুকরাগুলি কয়েক সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের এবং কোনো সেলাই ছাড়া ছিল, যা প্রথম নজরে সাধারণ টেক্সটাইলের মতো দেখাত।
আর্কাইভের প্রধান রেইনার হেরিংগের নির্দেশে বিশেষজ্ঞ দল টুকরাগুলির লেবেল ও সংযুক্ত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে সেগুলি বায়েউ ট্যাপেস্ট্রির অংশ হিসেবে শনাক্ত করেন। ট্যাপেস্ট্রি ৭০ মিটার (২৩০ ফুট) দীর্ঘ একটি সূচিকর্ম, যা ১০৬৬ সালে নরম্যান বিজয়ের ঘটনাকে ৫৮টি দৃশ্যে চিত্রিত করে। টুকরাগুলি ট্যাপেস্ট্রির নিচের স্তর থেকে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
হেরিংগ বায়েউ মেয়রের কাছে টুকরাগুলি উপস্থাপন করার সময় উল্লেখ করেন, “এই টুকরাগুলি ৮৫ বছর আগে নাজি শাসনকালে নেওয়া হয়েছিল; তাই সেগুলি ফ্রান্সে ফেরত দেওয়া স্বাভাবিক।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের আর্কাইভের দায়িত্ব হল এমন ঐতিহাসিক সম্পদকে যথাযথ মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।” এই প্রকাশনা স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।
শ্লাবো, যিনি ১৯৮৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন, ১৯৪১ সালে নাজি এসএসের একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে বায়েউতে পাঠানো হয়েছিলেন। সেই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল “জার্মানির বংশগত ঐতিহ্য” গবেষণা করা, যা রেসিস্ট্যান্ট এবং অ্যান্টি-সেমিটিক নীতি দ্বারা চালিত ছিল। শ্লাবোর দল ট্যাপেস্ট্রির নিচের স্তর থেকে ছোট টুকরা কেটে নিয়ে গোপনে জার্মানিতে নিয়ে আসে বলে ধারণা করা হয়।
বায়েউ ট্যাপেস্ট্রি ইতিহাসবিদদের মতে, এতে ৬২৬টি চরিত্র এবং ২০২টি ঘোড়া চিত্রিত হয়েছে, এবং এটি উইলিয়াম দ্য কনকোয়ারার ইংল্যান্ডের প্রথম নরম্যান রাজা হওয়ার ঘটনাকে চিত্রায়িত করে। ট্যাপেস্ট্রির এই অংশগুলি এখন পুনরুদ্ধার হওয়ায় ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অখণ্ডতা পুনরুদ্ধার হয়েছে।
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সেপ্টেম্বর মাসে ট্যাপেস্ট্রির একটি বৃহৎ প্রদর্শনী নির্ধারিত রয়েছে, যা যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে একটি বিতর্কিত চুক্তির অংশ। এই প্রদর্শনীটি ট্যাপেস্ট্রির আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি বাড়াবে এবং পুনরুদ্ধারকৃত টুকরাগুলির গুরুত্বকে আরও উজ্জ্বল করবে।
বৈশ্বিক পর্যায়ে নাজি-দখলকৃত শিল্পকর্মের ফেরত দেওয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ছে। জার্মানি ইতিমধ্যে বহু শিল্পকর্ম এবং নথিপত্র ফ্রান্স, পোল্যান্ড এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের কাছে ফেরত দিয়েছে। এই ধারা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সাংস্কৃতিক সম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টনকে শক্তিশালী করে।
একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “বায়েউ ট্যাপেস্ট্রির টুকরা ফেরত দেওয়া কেবল ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার নয়, বরং জার্মানি-ফ্রান্স সম্পর্কের নতুন মাইলস্টোন। এটি ভবিষ্যতে অন্যান্য লুটকৃত সম্পদের পুনরুদ্ধারের জন্য একটি রেফারেন্স পয়েন্ট তৈরি করবে।” এই ধরনের পদক্ষেপ কূটনৈতিক সংলাপকে সমৃদ্ধ করে এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বকে তুলে ধরে।
সারসংক্ষেপে, শ্লেসভিগ-হোলস্টেইন আর্কাইভের এই উদ্যোগ নাজি শাসনের সময় লুট করা শিল্পকর্মের পুনরুদ্ধারের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ট্যাপেস্ট্রির টুকরাগুলি ফ্রান্সে ফিরে যাওয়া কেবল ঐতিহাসিক স্মৃতির পুনর্গঠন নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সাংস্কৃতিক সম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টনের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।



