ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ১৫ জানুয়ারি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে রাশিয়ার সমর্থনের জন্য ভ্লাদিমির পুতিনকে ধন্যবাদ জানিয়ে দেশের বর্তমান অস্থিরতার প্রতি আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেছেন। বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে আয়োজিত হয়, যেখানে ইরানের সাম্প্রতিক প্রতিবাদ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আলোচনার মূল বিষয় ছিল।
সংযুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে চীন, পাকিস্তান ও রাশিয়া তেহরানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে, যদিও তারা প্রত্যেকেই ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ওপর ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। ত্রিপক্ষীয় সমর্থন ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
বৈঠকের পরদিন, পেজেশকিয়ান রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলে রাশিয়ার অবস্থানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, রাশিয়ার স্পষ্ট সমর্থন ইরানের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই ধন্যবাদসূচক মন্তব্যটি রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের ঐতিহাসিক বন্ধনকে পুনরায় জোরদার করেছে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সমর্থিত জায়নবাদী শাসনের ইরানের সাম্প্রতিক ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে বাড়িয়ে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারকে ক্ষুন্ন করেছে। এই বক্তব্যটি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ইউএন নিরাপত্তা পরিষদের রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেঞ্জিয়া তেহরানের প্রতিবাদকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘উত্তেজনা উসকে দেওয়া এবং আতঙ্ক ছড়ানোর’ অভিযোগ উত্থাপন করেন। নেবেঞ্জিয়া ইরানের চারপাশে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে ইরানের অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে এই বৈঠকটি একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্পষ্ট আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, বৈঠকের ফলাফল ইরানের স্বায়ত্তশাসন ও আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে টানাপোড়েন বাড়িয়ে তুলতে পারে।
রাশিয়ার সমর্থন ও চীনের নীতি-দিকনির্দেশনা ইরানের জন্য কূটনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করে, তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও ইউএনের আলোচনার ফলাফল ইরানের কূটনৈতিক ভারসাম্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। পেজেশকিয়ানের ফোনালাপের পরে রাশিয়ার অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা ইরানের কূটনৈতিক কৌশলে রাশিয়ার ভূমিকা বাড়িয়ে তুলবে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, রাশিয়া-ইরান সহযোগিতা ভবিষ্যতে নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনায় আরও দৃঢ় হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-প্রভাবকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে। তবে রাশিয়ার সমর্থনই একমাত্র সমাধান নয়; ইরানকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কমাতে হবে।
আসন্ন সপ্তাহগুলোতে নিরাপত্তা পরিষদের অতিরিক্ত বৈঠক বা বিশেষ সেশনের সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও প্রতিবাদ আন্দোলনের পরিণতি নিয়ে আরও বিশদ আলোচনা হতে পারে। রাশিয়া ও চীন এই আলোচনায় সমর্থনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে, আর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কঠোর হতে পারে।
এশীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে নিজস্ব নীতি নির্ধারণে সতর্কতা অবলম্বন করছে। পাকিস্তান, যা ঐতিহাসিকভাবে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইরানের স্বার্থ রক্ষার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়াতে পারে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে অনুষ্ঠিত ইউএন নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক গতিবিধিকে নতুন মোড় দিয়েছে। রাশিয়ার সমর্থন ও পেজেশকিয়ানের পুতিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা ইরানের কূটনৈতিক ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করার সংকেত দেয়, আর যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ভবিষ্যতে কীভাবে বিকশিত হবে তা এখনও অনিশ্চিত।



