ব্রিটিশ-ভারতীয় লেখক স্যালমান রুশদি আগস্ট ২০২২-এ নিউ ইয়র্কের একটি রিট্রিটে আক্রমণের শিকার হন, তবে তিনি জীবিত বেঁচে গেছেন। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে এবং তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। রুশদি এবং তার পরিবার এই ঘটনার পরবর্তী পর্যায়ে কীভাবে মোকাবিলা করেছেন, তা এখন একটি নতুন ডকুমেন্টারির মাধ্যমে প্রকাশ পাবে।
সেই সন্ধ্যায় এক অচেনা যুবক রুশদির দিকে আক্রমণ করে, তার গলা ও মুখে আঘাত হানে এবং দর্শকবৃন্দ শকড হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রুশদি তৎক্ষণাৎ প্রতিরোধের চেষ্টা করেন, তবে আক্রমণকারী তাকে শক্তভাবে ধাক্কা দেয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজনের তৎকালীন প্রতিক্রিয়া এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি পরবর্তীতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।
আক্রমণের পর রুশদি তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে ভর্তি হন, যেখানে তার গলায় গভীর কাট এবং চোখে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। চিকিৎসা দল তাকে তীব্র যত্নে রাখে, এবং তার শারীরিক অবস্থার গুরুতরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। রুশদির শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য বিশেষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় এবং তার চোখের গঠনেও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি দেখা যায়।
ইউনিটের ভিতরে তাপমাত্রা শূন্যের কাছাকাছি ছিল, এবং বিশাল নীল রঙের ভেন্টিলেটর ঘুরছিল, যা রুশদির স্ত্রী র্যাচেল এলিজা গ্রিফিথসের মতে “এমন রোগী বিছানা থেকে উঠে না” এমন অনুভূতি জাগায়। তিনি রুশদির পাশে থেকে তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং ডকুমেন্টারির জন্য ভিডিও ডায়েরি রেকর্ড করেন। তার বিবরণে রোগীর শারীরিক যন্ত্রপাতি, শীতল পরিবেশ এবং জীবনের ঝুঁকির মুহূর্তগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
রুশদি নিজে এই কঠিন সময়ে জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেন। তিনি বলেন, “সেই দিনগুলোতে আমরা জানতাম না আমরা বেঁচে থাকব কিনা” এবং তার শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক ভয়ও উল্লেখ করেন। তার এই অভিজ্ঞতা তার লেখালেখি ও মুক্তমনা প্রকাশের পথে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে।
অ্যাক্স গিবনি পরিচালিত নতুন ডকুমেন্টারির শিরোনাম “Knife: The Attempted Murder of Salman Rushdie”। এই চলচ্চিত্রটি রুশদির বেঁচে থাকার গল্প, তার স্ত্রীর সঙ্গে পারস্পরিক সমর্থন এবং আক্রমণের পরের মানসিক সংগ্রামকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। গিবনি ডকুমেন্টারিতে রুশদির জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে পুনর্গঠন করে উপস্থাপন করেছেন।
ডকুমেন্টারির শুটিংয়ের সময় রুশদির স্ত্রী র্যাচেল এলিজা গ্রিফিথস ভিডিও ডায়েরি রেকর্ড করেন, যেখানে তিনি হাসপাতালের ঘর, যন্ত্রপাতি এবং রুশদির অবস্থা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন। এই রেকর্ডিংগুলো ডকুমেন্টারির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় এবং দর্শকদেরকে ঘটনার পরের বাস্তবতা অনুভব করায়। তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি চলচ্চিত্রকে আরও মানবিক ও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
ডকুমেন্টারিটি ২৫ জানুয়ারি স্যান্ড্যান্স চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্বপ্রসারী প্রিমিয়ার পাবে। স্যান্ড্যান্সের এই প্লাটফর্মটি দমন ও সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঐতিহ্যবাহী মঞ্চ হিসেবে পরিচিত, যা রুশদির গল্পের সঙ্গে সুসংগত। এই উৎসবে চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী রুশদির বেঁচে থাকার বার্তাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও শক্তিশালী করবে।
স্যান্ড্যান্সের পাশাপাশি গিবনি ও রুশদি দম্পতি ক্রিসমাসের আগে ম্যানহাটনের গিবনির অফিসে সাক্ষাৎ করেন। এই সময়ে রুশদি ইতিমধ্যে শারীরিকভাবে বেশ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছেন এবং তার স্ত্রী সঙ্গে বসে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। তাদের এই সাক্ষাৎ ডকুমেন্টারির প্রস্তুতি ও প্রচারমূলক কাজের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রুশদি বারবার প্রকাশ করেছেন যে তিনি কোনো প্রতীক হতে চান না, বরং তার গল্পকে ব্যক্তিগত বেঁচে থাকার সংগ্রাম হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। তিনি নিজের নাম ও কাজকে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় লড়াইয়ের মঞ্চে ব্যবহার হতে বিরত রাখতে চেয়েছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি তার দীর্ঘদিনের সাহিত্যিক ক্যারিয়ার ও স্বাধীন প্রকাশের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সাহিত্য ও স্বাধীন প্রকাশের ইতিহাসে রুশদি বহুবার হুমকির মুখে পড়েছেন, তবে তিনি সর্বদা তার কাজ চালিয়ে গেছেন। তার বেঁচে থাকা কেবল তার নিজের নয়, বরং বিশ্বব্যাপী লেখক ও প্রকাশকদের জন্য একটি প্রেরণার উৎস। এই ডকুমেন্টারিটি তার জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করবে।
ডকুমেন্টারির মাধ্যমে রুশদি এবং তার পরিবার যে মানসিক ও শারীরিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন, তা দর্শকদেরকে গভীরভাবে স্পর্শ করবে। চলচ্চিত্রটি তার বেঁচে থাকার গল্পকে শুধু একটি ঘটনা নয়, বরং মানবিক দৃঢ়তা ও পারস্পরিক সমর্থনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরবে। এইভাবে রুশদির গল্প নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার স্রোত হয়ে উঠবে।
ডকুমেন্টারির প্রিমিয়ার এবং স্যান্ড্যান্সের মঞ্চে তার উপস্থিতি রুশদির বেঁচে থাকার বার্তাকে আরও বিস্তৃত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেবে। এই চলচ্চিত্রটি মুক্তমনা প্রকাশের জন্য লড়াই করা সকলের জন্য একটি স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে। রুশদির বেঁচে থাকা এবং তার কাজের প্রতি সম্মান জানাতে এই ডকুমেন্টারিটি দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সর্বশেষে, রুশদির বেঁচে থাকার গল্প এবং গিবনির ডকুমেন্টারির মাধ্যমে প্রকাশিত এই সত্যিকারের মানবিক সংগ্রাম, পাঠকদেরকে স্বাধীন প্রকাশের গুরুত্ব পুনর্বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করবে। এই চলচ্চিত্রটি দেখার মাধ্যমে আপনি রুশদির জীবনের গভীরতা ও তার সাহসিকতা সম্পর্কে আরও জানবেন এবং মুক্তমনা প্রকাশের জন্য সমর্থন বাড়াতে পারবেন।



