গতরাত ঢাকা‑উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের এক বহুতল আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে ছয়জনের প্রাণ ত্যাগ এবং তেরজনের গুরুতর আঘাত নিশ্চিত হয়েছে। আগুনের সূত্রপাতের সঠিক কারণ এখনও তদন্তাধীন, তবে প্রাথমিক ধারণা রন্ধনঘরের বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা গ্যাস লিকেজের দিকে ইঙ্গিত করে।
আগুনের শিখা দ্বিতীয় তলা থেকে ছড়িয়ে দ্রুত উপরের তলাগুলোতে পৌঁছায়, ফলে পুরো ভবনের অভ্যন্তর ধোঁয়ায় ঘেরা থাকে। ধোঁয়ার ঘনত্ব এত বেশি ছিল যে বাসিন্দারা দরজা বন্ধ করে নিরাপদে থাকার চেষ্টা করেন, তবে অবশেষে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় সবাইকে নিরাপদে বের করা হয়।
একজন বেঁচে থাকা বাসিন্দা, শিবলু, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি জানান, রাতের নিদ্রা ভাঙা শুরু হয় গ্লাস ভাঙার শব্দে, যা ধোঁয়ায় ভেজা ফ্লোরের উপর গুঁড়ো হয়ে পড়ছিল। শিবলু এবং তার পরিবার তৎক্ষণাৎ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তবে ঘন ধোঁয়ার কারণে দরজা বন্ধ করে ভেতরে রইতে বাধ্য হন। ফায়ার সার্ভিসের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত তারা নিরাপদে বেরিয়ে আসে।
শিবলু চতুর্থ তলার বাসিন্দা এবং তার পরিবারে স্ত্রী ও দুই সন্তান অন্তর্ভুক্ত। তিনি বর্ণনা করেন, আগুনের সময় তারা ঘুমিয়ে ছিলেন এবং হঠাৎ গ্লাস ভাঙার শব্দে জেগে ওঠেন। ধোঁয়ার ঘনত্ব এবং শিখার তীব্রতা তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে, যদিও দরজা বন্ধ করে রাখার সিদ্ধান্ত তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের জনসংযোগ কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, আগুনের ফলে ছয়জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং তেরজনকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মৃতদের মধ্যে দুইটি পরিবার অন্তর্ভুক্ত, যারা পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটে বাস করতেন।
মৃত্যুজনিত পরিবারগুলোর মধ্যে কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার সুবর্ণা (৩৭) এবং তাদের দুই বছর বয়সী ছেলে কাজী ফাইয়াজ রিশান (২) অন্তর্ভুক্ত। অন্য পরিবারে মো. হারিছ উদ্দিন (৫২), তার কিশোর সন্তান মো. রাহাব (১৭) এবং হারিছের ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৪) ছিলেন, যাঁদের গ্রাম ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে অবস্থিত।
ঘটনা স্থলে পুলিশ ও সিআইডি (গোয়েন্দা শাখা) কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন এবং ভবনের চারপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে কঠোর সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্রাইম সিন টেপ দিয়ে ভবনের প্রধান প্রবেশদ্বার ও ফটক ঘেরা হয়েছে, যাতে অনধিকার প্রবেশ রোধ করা যায়।
দুপুরের পর থেকে স্থানীয় জনগণ বড় সংখ্যায় জড়ো হয়েছে, তবে নিরাপত্তা বজায় রাখতে তারা টেপের বাইরে থেকে ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করছে। পুলিশ জানায়, ভবনের ভিতরে থাকা দুই পরিবারের সদস্যই নিহত হয়েছেন, আর বাকি বাসিন্দারা ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি রফিক আহমেদ উল্লেখ করেন, প্রাথমিক তদন্তে রন্ধনঘরের কোনো বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা গ্যাস লিকেজের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
অধিক তদন্তের ফলাফল অনুযায়ী, যদি গ্যাস লিকেজ বা বৈদ্যুতিক শোরগোলের দোষ প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ যৌথভাবে ঘটনাস্থল থেকে সব প্রমাণ সংগ্রহ করে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্ঘটনা রোধ করা যায়।



