ইরাকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনব্যবস্থার অনিশ্চয়তা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইরান ভারতের জন্য আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দিকে প্রবেশের প্রধান ভূমি পথ, যেখানে চাবাহার বন্দর প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি বাণিজ্যিক সংযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমান অস্থিতিশীলতা এই পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তান ভারতের স্থলপথকে সীমাবদ্ধ করে রাখায় তেহরানই একমাত্র বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছে। চাবাহার বন্দর, যা ভারতের বহুমূল্য বিনিয়োগের অধীনে নির্মাণাধীন, ইরানের উপকূলে অবস্থিত এবং আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি সমুদ্রপথের সংযোগের লক্ষ্য রাখে। এই প্রকল্পের সফলতা ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং মহাসাগরীয় নিরাপত্তা উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, ভারত-ইরান সম্পর্ক আদর্শিক নয়, বরং কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরান পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের প্রভাবকে সীমিত করতে ভারতের সহায়তা করেছে, ফলে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ভারসাম্য রক্ষায় ইরানের ভূমিকা অপরিহার্য। এখন যদি ইরানে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা বজায় থাকে বা এমন কোনো শাসন আসে যা ভারতের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন না হয়, তবে এই কৌশলগত সুবিধা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা চাবাহার বন্দর প্রকল্পের সময়সূচি ও অর্থায়নে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। বিনিয়োগের পরিমাণ শত শত কোটি ডলার, যা ভারতের বাণিজ্যিক রুটকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করার জন্য অপরিহার্য। যদি প্রকল্পটি বিলম্বিত হয় বা রদ করা হয়, তবে ভারতের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়া মহাদেশীয় বাণিজ্য নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অধিকন্তু, ইরানের অভ্যন্তরীণ অশান্তি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে। শিয়া প্রধান ইরান পাকিস্তানের প্রভাবকে সীমিত করার ক্ষেত্রে ভারতের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে; এখন এই ভারসাম্য নষ্ট হলে অঞ্চলে নতুন শক্তি গঠনের ঝুঁকি বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, ইরানের অস্থিতিশীলতা কেবল দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে নতুন বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের ওপর আরোপের হুমকি বাড়ার ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সূত্র অনুযায়ী, প্রায় দুই হাজার কোটি রুপির মূল্যমানের ভারতীয় পণ্য বর্তমানে ইরানের বন্দরগুলোতে আটকে রয়েছে, যা বাণিজ্যিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছে।
দিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হল, যদি ইরানের বর্তমান শাসন কাঠামো ভেঙে যায় এবং তার স্থলে কোনো উগ্রবাদী বা অস্থিতিশীল সরকার গড়ে ওঠে, তবে তা ভারতের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ইরান-ইন্ডিয়া কৌশলগত সহযোগিতা দুর্বল হয়ে যাবে এবং ভারতের আঞ্চলিক অবস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ইরানের সম্ভাব্য অস্থিরতা চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ার সুযোগও তৈরি করতে পারে। যদি ইরান চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বলয়ে আরও প্রবেশ করে, তবে ভারতের কৌশলগত প্রভাব কমে যাবে এবং অঞ্চলে চীনের আধিপত্য বাড়বে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে দিল্লি সরকার ইতিমধ্যে বিকল্প পথ অনুসন্ধানে মনোনিবেশ করেছে। তেহরানের পাশাপাশি, ভারত পারস্য উপসাগরের অন্যান্য বন্দর ও সড়ক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা চালু করেছে। তবে এই বিকল্পগুলোও ইরানের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল, ফলে পুরো কৌশলগত কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে ইরানের শাসন পরিবর্তন বা দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা স্থায়ী হলে, চাবাহার বন্দর প্রকল্পের অর্থায়ন ও নির্মাণে বাধা আসতে পারে, যা ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একই সঙ্গে, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন চ্যালেঞ্জের উদ্ভব ঘটবে, যেখানে পাকিস্তান ও চীন ইরানের পরিবর্তিত অবস্থান থেকে লাভবান হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ভারতের কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য একাধিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। চাবাহার বন্দর প্রকল্পের সাফল্য, ইরান-ভারত সম্পর্কের স্থায়িত্ব এবং অঞ্চলের সামগ্রিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য দিল্লি এখন দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি এড়ানো যায়।



