কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ১৬ জানুয়ারি বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনা রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করে দুই দেশের মধ্যে নতুন কৌশলগত অংশীদারিত্বের সূচনা ঘোষণা করেন। উভয় পক্ষ আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়াতে এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে ইচ্ছুক বলে প্রকাশ পেয়েছে।
বৈঠকে কার্নি উল্লেখ করেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিবেশে কানাডা ও চীন একসঙ্গে কাজ করে চাপ কমাতে পারে এবং অতীতের ইতিবাচক দিকগুলোকে কাজে লাগিয়ে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা সম্ভব। শি জিনপিংও একই সময়ে কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন মডেল গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন, যা কৃষি, জ্বালানি, পরিষ্কার প্রযুক্তি ও কাঠজাত পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।
শুল্ক নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনও ঘোষিত হয়। চীন কানাডার ক্যানোলা বীজের ওপর আরোপিত শুল্ক ৮৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনবে। লবস্টার ও মটরশুঁটির মতো অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও একই সময়ে শুল্কমুক্তি কার্যকর হতে পারে, যা কানাডার রপ্তানি বাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনা তৈরি করে। এই পদক্ষেপের ফলে চীনের প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের ক্যানোলা বাজারে পুনরায় প্রবেশের সুযোগ পাবেন কানাডা।
কানাডা-চীন সম্পর্কের বর্তমান উন্নয়নটি ২০১৭ সালের পর প্রথমবারের মতো কোনো কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী চীনের সফরকে চিহ্নিত করে। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে হুয়াওয়ের শীর্ষ নির্বাহী মেং ওয়ানঝুকে গ্রেপ্তার করার পর উভয় দেশের সম্পর্ক তলানিতে নেমে যায়। এরপর চীনে দুই কানাডীয় নাগরিকের আটক হওয়া ঘটনাও সম্পর্ককে আরও খারাপ করে তোলায় ভূমিকা রাখে।
বৈঠকে উভয় দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে চীনে কানাডার রপ্তানি ৫০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে কৃষি, জ্বালানি, পরিষ্কার প্রযুক্তি এবং কাঠজাত পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে বলে উভয় পক্ষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে ক্যানোলা, লবস্টার ও মটরশুঁটি মতো পণ্যের শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে রপ্তানি পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
কানাডার অভ্যন্তরে এই কূটনৈতিক পদক্ষেপের প্রতি মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনী বিতর্কের সময় কার্নি নিজেই চীনকে কানাডার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে থাকলেও, এখন তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার পথে অগ্রসর হয়েছেন। এই দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে যে, নতুন অংশীদারিত্বের স্থায়িত্ব কতটা নিশ্চিত করা যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মিত্রতা থাকা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে কানাডা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের দিকে ঝুঁকেছে। এই পরিবর্তনটি উত্তর আমেরিকায় চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি কানাডার বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই অংশীদারিত্বের সূচনা দেশের কৃষি ও প্রযুক্তি সেক্টরে বৈচিত্র্য আনার উদ্দেশ্য বহন করে। শি জিনপিং উল্লেখ করেন, নতুন ধরনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে উভয় দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে উভয় দেশ একে অপরের বাজারে প্রবেশের বাধা কমিয়ে বিনিয়োগের পরিসর বাড়াবে।
কানাডার দিক থেকে, শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে রপ্তানি শিল্পের প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং কৃষক ও উৎপাদকদের জন্য নতুন বাজারের দরজা খুলে যাবে। বিশেষ করে ক্যানোলা বীজের ক্ষেত্রে শুল্কের বড় হ্রাস কানাডার কৃষক সমিতিগুলোর জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে লবস্টার ও মটরশুঁটির শুল্কমুক্তি সামুদ্রিক ও শাকসবজি রপ্তানির ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অবশেষে, এই কূটনৈতিক পদক্ষেপের পরবর্তী ধাপগুলো কী হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। উভয় দেশ শীঘ্রই বিনিয়োগ চুক্তি ও বাণিজ্যিক আলোচনার বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করতে পারে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, কানাডার অভ্যন্তরে নিরাপত্তা উদ্বেগ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা নতুন অংশীদারিত্বের টেকসইতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে কীভাবে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিকশিত হবে, তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজর রাখার বিষয় হয়ে থাকবে।



