অন্তর্বর্তী সরকার গত বৃহস্পতিবার জনস্বার্থে একটি আদেশ জারি করে, ওমর বিন হাদিকে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব পদে চুক্তিভিত্তিকভাবে নিয়োগ দেয়। এই নিয়োগের তথ্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখার প্রজ্ঞাপনে প্রকাশিত হয় এবং রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে যুগ্ম সচিব আবুল হায়াত মো. রফিকের স্বাক্ষর রয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হয়েছে, ওমর বিন হাদিকে কোনো বেসরকারি, আধা-সরকারি বা অন্য কোনো পেশাগত সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগের শর্তে তিন বছরের চুক্তি ভিত্তিতে নিয়োগ করা হবে। চুক্তির নির্দিষ্ট শর্তাবলী আলাদা চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকবে এবং নিয়োগের শুরুর তারিখ থেকে এই শর্ত কার্যকর হবে।
ওমর বিন হাদি হলেন শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির বড় ভাই, যিনি জুলাই ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মঞ্চ ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা ও মুখপাত্র হিসেবে কাজ করতেন। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিলেন এবং তার বোনের মৃত্যুর পরেও তার নাম ও কাজের স্মৃতি বহন করা হয়।
শরিফ ওসমান বিন হাদি জুলাই ২০২৪-এ ঘটে যাওয়া গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ হিসেবে উদয় হন, এরপর তিনি ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করে তার রাজনৈতিক লক্ষ্যকে সংগঠিত করেন। মঞ্চের প্রধান কার্যক্রমে তিনি জনমত গঠন, প্রতিবাদ সংগঠন এবং সরকারী নীতি সমালোচনার ভূমিকা পালন করেন, যা তাকে বিরোধী গোষ্ঠীর নজরে নিয়ে আসে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল ঘোষণার পরদিন, ১২ ডিসেম্বর দুপুর ২টা ২০ মিনিটে, ঢাকা পুরানা পল্টনের বক্স, কালভার্ট রোডে ওসমান হাদির মাথায় গুলি করা হয়। গুলি মারার পর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তবে তার অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যায়।
অবস্থার তীব্রতা বিবেচনা করে, ১৫ ডিসেম্বর দুপুরে তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয় উন্নত চিকিৎসার জন্য। সিঙ্গাপুরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর, ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষের তদন্তে প্রকাশ পায় যে, অধিপত্যবাদী গোষ্ঠী তার রাজনৈতিক কার্যকলাপকে হুমকি হিসেবে দেখে তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
ওমর বিন হাদি তার ভাইয়ের মৃত্যুর পর ২০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত জানাজায় উপস্থিত হন। জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষ অংশ নেয় এবং শেষমেশ তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ-সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে শায়িত করা হয়।
শরিফের ভাই ওমর বিন হাদি জানাজার পর একটি প্রকাশ্যে বলেন, বিচার পাওয়ার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানান। তার এই বক্তব্য ২১ ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত হয় এবং বিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে নতুন সজাগতা সৃষ্টি করে।
ওমর বিন হাদির নতুন দায়িত্বের ফলে ইনকিলাব মঞ্চের কার্যক্রমে সম্ভাব্য পরিবর্তন দেখা যাবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে তার উপস্থিতি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিরোধী গোষ্ঠীর আন্তর্জাতিক সমর্থন বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপকে কিছু বিশ্লেষক সমর্থন করেন, কারণ এটি শাসনকালের রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো এই নিয়োগকে সরকারের স্বার্থপরতা ও রাজনৈতিক পুরস্কার বিতরণের উদাহরণ হিসেবে সমালোচনা করেছে।
ভবিষ্যতে ওমর বিন হাদির দায়িত্ব পালন এবং তার ভাইয়ের স্মৃতির প্রতি সম্মান বজায় রাখার মধ্যে কী ধরনের সমন্বয় হবে, তা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে নতুন মোড় আনতে পারে। সরকার ও বিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান আলোচনায় এই নিয়োগের প্রভাব কী হবে, তা সময়ই প্রকাশ করবে।



