ইরানে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক অসন্তোষের ফলে সৃষ্ট প্রতিবাদ দমন করা হয়েছে, ফলে শিয়া শাসকগোষ্ঠী কঠিন অবস্থায় রয়েছে। এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তার পশ্চিম এশীয় কৌশলকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।
দিল্লি ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘকালীন ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে, যা ভৌগোলিক অবস্থান ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের ওপর ভিত্তি করে কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত হয়েছে। পাকিস্তান আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দিকে ভূমি পথে প্রবেশ বন্ধ করার ফলে, ইরান ভারতের একমাত্র কার্যকর পশ্চিমমুখী করিডর হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইরানের শিয়া নেতৃত্ব পাকিস্তানের প্রভাবের সমতা রক্ষায় ভূমিকা পালন করে, ফলে এটি ভারতের পশ্চিম এশীয় নীতির একটি স্থিতিশীল স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। এই সমতা ভঙ্গ হলে, বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তন, পাকিস্তান থেকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং চীনের আঞ্চলিক প্রভাবের বৃদ্ধি ভারতের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ইরানের অস্থিতিশীলতা কূটনৈতিক জোট, বাণিজ্যিক পথ এবং নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনকে বাধ্য করতে পারে, যা নতুন নীতি নির্ধারণে দশকের পর দশক সময়সাপেক্ষ হতে পারে। বিশেষ করে চাবাহার বন্দর ভারতের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে; এর মাধ্যমে পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে ইরান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে স্থল ও রেল সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব।
এই সংযোগগুলো দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সমন্বয়, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং পরিকল্পনা প্রয়োজন। তেহরানে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে, চাবাহার বন্দর কৌশলগত সম্পদ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানে রূপান্তরিত হতে পারে। একজন বিশ্লেষক, যিনি জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, উল্লেখ করেছেন যে খামেনি-পরবর্তী ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বন্দরকে স্থিতিশীলতার বদলে ঝুঁকির উৎস করে তুলতে পারে।
ইরান, যদিও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের আঞ্চলিক প্রভাব রোধে একটি বাধা হিসেবে কাজ করেছে। তেহরানের সুন্নি নেতারা পাকিস্তানি সুন্নি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন, যারা ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে তেহরানের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করে।
ভারত-ইরান সম্পর্কের মূল ভিত্তি চাবাহার বন্দর ছাড়াও জ্বালানি, বাণিজ্য এবং অবকাঠামো প্রকল্পে রয়েছে। ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের ফলে এই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ধীর হতে পারে, যা ভারতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করবে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা চীনের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ার সুযোগও তৈরি করতে পারে। চীন ইতিমধ্যে ইরানের সাথে বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বাড়াচ্ছে; যদি ইরান ভারতের উপর নির্ভরতা কমিয়ে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়, তবে ভারতের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হবে।
অধিকন্তু, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনও ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। যদিও বর্তমান সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনকাল শেষ, তবে পূর্বের নীতি ও তার ফলে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক সঙ্কটের স্মৃতি এখনও ভারতের কূটনৈতিক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলে।
ইরানে সম্ভাব্য ক্ষমতার পরিবর্তন কেবল রাজনৈতিক নয়, নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করে। তেহরানের শিয়া ও সুন্নি গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় ভঙ্গ হলে, সীমানা পারাপার সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম বাড়তে পারে, যা ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ।
ভারত এইসব ঝুঁকি মোকাবিলায় বিকল্প পথ অনুসন্ধান করছে, তবে বর্তমান অবস্থা দেখায় যে ইরানের অস্থিতিশীলতা দূর করা কঠিন। তাই, দিল্লি তেহরানের রাজনৈতিক গতিবিধি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোকে সক্রিয় রাখছে।
সারসংক্ষেপে, ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্য একাধিক মাত্রার ঝুঁকি তৈরি করে। চাবাহার বন্দর, বাণিজ্যিক সংযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য—all these aspects hinge upon ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, যা ভবিষ্যতে ভারতের নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



