ইনকিলাব মঞ্চের শাসনকর্তা শারিফ ওসমান বিন হাদির হত্যার জন্য আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জুমা নামাজের পর প্রতিবাদে রোডম্যাপ তৈরি করা হয়। শাসনকর্তা ও তার সমর্থকরা মসজিদ থেকে বেরিয়ে পল্টানে অবস্থিত মূল রাস্তায় একটি শোভাযাত্রা চালিয়ে যায়। শোভাযাত্রার সময় অংশগ্রহণকারীরা “আমরা ন্যায় চাই”, “লাল সবুজের পোটাকে, হাদি তোমায় দেখা যায়” ইত্যাদি স্লোগান উচ্চারণ করে। এই স্লোগানগুলোতে হাদির নাম ও তার প্রতি সমর্থন স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। অংশগ্রহণকারীরা হাদির মৃত্যুর পর তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে, দ্রুত তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি চেয়েছেন।
গতকাল ঢাকা উচ্চ আদালত ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টকে (সিআইডি) হাদির হত্যাকাণ্ডের পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেয়। এই আদেশটি ঢাকা অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম কর্তৃক জারি করা হয়। আদেশের পেছনে মূল অভিযোগ ছিল যে প্রাথমিক তদন্তে কিছু ত্রুটি রয়েছে এবং অভিযোগকারী প্রাথমিক চার্জ শিটের প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন। অভিযোগকারী অতিরিক্ত তদন্তের দাবি জানিয়ে, চার্জ শিটের বিরুদ্ধে নো-কনফিডেন্স মোশন দাখিল করেন।
আদালত হাদির হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ প্রতিবেদন জানুয়ারি ২০ তারিখের মধ্যে সিআইডি থেকে জমা দিতে নির্দেশ দেয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ডেপুটি কমিশনার অফ প্রোসিকিউশন মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাসান এই আদেশের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে তদন্তের অগ্রগতি ও ফলাফল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সময়মতো পৌঁছে দেওয়া হবে।
শারিফ ওসমান বিন হাদি, যিনি ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নাম নথিভুক্ত করছিলেন, ১২ ডিসেম্বর গত বছর পল্টানে গুলি চালিয়ে নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে দ্রুত সিঙ্গাপুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ারলিফট করা হয়। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা গ্রহণের পর ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়। তার মৃত্যুর পর পরিবার ও সমর্থকরা ন্যায়বিচার ও দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন।
হাদির হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সিআইডি নতুন দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত সাক্ষী ও প্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে। তদন্তের আওতায় গুলিবিদ্ধের সময়ের সিকিউরিটি ক্যামেরা ফুটেজ, গ্যাংস্টারদের সঙ্গে সম্ভাব্য সংযোগ এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এই তথ্যগুলোকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করবে।
প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে ইনকিলাব মঞ্চের পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনও উপস্থিত ছিল। তারা একত্রে হাদির মৃত্যুর পেছনের সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য একসাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। শোভাযাত্রা শেষে অংশগ্রহণকারীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটের সামনে একত্রিত হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মঞ্চে নীরবতা বজায় রাখেন।
আদালতের আদেশের পর সিআইডি দ্রুত তদন্তের পরিকল্পনা তৈরি করেছে। তদন্তের প্রথম ধাপে গুলিবিদ্ধের সময়ের পার্শ্ববর্তী এলাকার নিরাপত্তা রেকর্ড, গ্যাংস্টারদের সঙ্গে সম্ভাব্য লেনদেন এবং হাদির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিশ্লেষণ করা হবে। এছাড়া হাদির পরিবার ও সাক্ষীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে যাতে সব দিক থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যায়।
হাদির মৃত্যুর পর তার পরিবার ও সমর্থকরা বহুবার ন্যায়বিচার চেয়ে আসছেন। তারা উল্লেখ করেন যে প্রাথমিক তদন্তে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়েছে এবং তাই আদালতকে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিবার দাবি করে যে হাদির মৃত্যুর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে, তবে তা নিশ্চিত করতে সঠিক প্রমাণের প্রয়োজন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডেপুটি কমিশনার আশিস বিন হাসান জানান, সিআইডি তদন্তের ফলাফল জানুয়ারি ২০ তারিখের মধ্যে আদালতে জমা হবে এবং তা ভিত্তিক যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে তদন্তের সময় কোনো বাধা বা হস্তক্ষেপ না ঘটতে দেওয়া হবে এবং সব প্রাসঙ্গিক তথ্য স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা হবে।
হাদির মৃত্যুর পর থেকে রাজনৈতিক পরিবেশে উত্তেজনা বেড়েছে। বিভিন্ন দল ও সংগঠন হাদির ন্যায়বিচার দাবি করে প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আদালতের আদেশ ও সিআইডি তদন্তের ফলাফল দেশের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সর্বশেষে, ইনকিলাব মঞ্চের শোভাযাত্রা ও আদালতের আদেশ দুটোই হাদির ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া পদক্ষেপ। তদন্তের অগ্রগতি ও ফলাফল দেশের নাগরিকদের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।



