১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা প্রথম সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে নারী, মেয়ে ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ বাড়ছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (HRW) নারী অধিকার বিভাগ ১৪ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পুলিশ কর্তৃক সংগ্রহ করা তথ্য অনুসারে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়কালে ঘটিত অপরাধের সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেমের মন্তব্যে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় গোষ্ঠীর কার্যক্রম ও বক্তৃতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও সমাজে অংশগ্রহণকে সীমাবদ্ধ করার লক্ষ্য রাখে। তিনি উল্লেখ করেন, এই গোষ্ঠীগুলো নারীর অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলতে চায়।
মে ২০২৫-এ কঠোর ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের লিঙ্গ সমতা ও নারীর অধিকার উন্নয়নের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাদের দাবি ছিল ‘ইসলামবিরোধী’ কার্যক্রম বন্ধ করা। এই প্রতিবাদে তারা সরকারকে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা রক্ষার নামে নারীর অধিকারকে সীমাবদ্ধ করার অভিযোগ তুলেছে।
প্রতিবাদ পরবর্তী সময়ে নারীরা মৌখিক, শারীরিক ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ধারাবাহিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিশেষত সামাজিক মিডিয়ায় গালিগালাজ, হুমকি এবং গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মাধ্যমে নারীর মতপ্রকাশকে দমন করার প্রচেষ্টা বাড়ছে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপরও সহিংসতা বাড়ছে। গত ডিসেম্বরে ২৭ বছর বয়সী পোশাককর্মী দীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একটি গোষ্ঠী পিটিয়ে হত্যা করে। এই ঘটনার পর মানবাধিকার সংস্থাগুলো হিন্দুদের বিরুদ্ধে মোট ৫১টি সহিংসতার তথ্য সংগ্রহ করেছে, যার মধ্যে ১০টি হত্যাকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত।
চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুদের ওপর অব্যাহত নির্যাতনের রেকর্ডও প্রতিবেদন থেকে পাওয়া যায়। এই গোষ্ঠীগুলোকে প্রায়শই ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে হিংসা ও হুমকির মুখে রাখা হয়।
বাংলাদেশে পূর্বে দুজন নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য ছিল। তবুও রাজনৈতিক মঞ্চে নারীর অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। আসন্ন নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দলের কোনো নারী প্রার্থী নেই, যা নারী প্রতিনিধিত্বের অভাবকে প্রকাশ করে।
অন্তর্বর্তী সরকার লিঙ্গ সমতা ও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার জন্য নতুন নীতি প্রণয়ন করার ঘোষণা দিয়েছে। সরকারী বিবৃতি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অপরাধের তদন্ত দ্রুততর করার জন্য বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়ার ত্বরান্বিত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।
আইনি দিক থেকে, হিংসা সংক্রান্ত মামলাগুলো বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম উচ্চ আদালতে চলমান। আদালতকে অনুরোধ করা হয়েছে যাতে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায় এবং ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করা হয়।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে যে, নির্বাচনের আগে নারীর নিরাপত্তা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।



