চীন অর্থনীতির গতিবিধি নিয়ে বিশ্লেষকদের এক সমীক্ষা প্রকাশের পর, সরকারী তথ্য প্রকাশের আগে জানা গেছে যে ২০২৪ সালে দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার গত ত্রিশ বছরে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে, যা মহামারীর পূর্বের কোনো বছরে দেখা যায়নি। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন যে, এই ধীরগতি মূলত রিয়েল এস্টেট বাজারের অবনতির সঙ্গে যুক্ত, যদিও ভোক্তা ব্যয় বাড়াতে সরকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা রপ্তানি ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণে প্রভাবিত হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং গত মাসে উল্লেখ করেন যে, ২০২৫ সালের জন্য দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য প্রায় পাঁচ শতাংশের আশেপাশে থাকবে। তবে, বিশ্লেষক গোষ্ঠীর মধ্যম অনুমান ৪.৯ শতাংশের কাছাকাছি, যা ১৯৯০ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন বৃদ্ধি নির্দেশ করে, যখন চীনকে পশ্চিমা দেশগুলোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
মুডি’স অ্যানালিটিক্সের সারা ট্যানের মতে, সরকার এই সংখ্যাকে যথেষ্ট বলে গণ্য করে এবং পাঁচ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করবে, যা রাজনৈতিকভাবে একটি সান্ত্বনা হিসেবে কাজ করবে। তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, বৃদ্ধির গঠনগত দিক থেকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থা রয়েছে এবং সরকারী পরিসংখ্যান বাস্তব মাটির দুর্বল মনোভাবকে আড়াল করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের রিয়েল এস্টেট সেক্টরই প্রধান বাধা, যেখানে ধারাবাহিক ঋণ সংকটের পরও সুদের হার কমানো এবং গৃহ ক্রয়ের শর্ত শিথিল করার পরেও বাজার পুনরুদ্ধার হয়নি। কিছু বড় শহরে বাড়ির দাম সামান্য বাড়লেও, সামগ্রিক বাজার এখনও স্থবির অবস্থায় রয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাক্সের বিশ্লেষক দল উল্লেখ করেছেন যে, স্বল্পমেয়াদে রিয়েল এস্টেটের তলদেশ স্পষ্ট নয় এবং ত্বরিত পদক্ষেপ না নিলে বাজারের অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা রিয়েল এস্টেটের অতিরিক্ত স্টককে সাশ্রয়ী আবাসিক ইউনিটে রূপান্তর করার মতো দৃঢ় নীতি না গ্রহণ করলে, সেক্টরটি দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীল থাকবে বলে সতর্ক করেছেন। একই সঙ্গে, সম্পত্তি ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগও গত বছর হ্রাস পেয়েছে। জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ ২.৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ হ্রাস।
ম্যাককোয়ারি গ্রুপের ল্যারি হু এবং ইউশিয়াও ঝাং উল্লেখ করেন যে, এই পতনের কারণ হতে পারে বেইজিংয়ের অপ্রকাশিত ডেটা সংশোধন, এবং তারা নীতিনির্ধারকদের তাত্ক্ষণিক হস্তক্ষেপের প্রত্যাশা করেন না। তারা পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, ২০২৬ সালে সম্পত্তি বিনিয়োগে প্রায় ১২ শতাংশের হ্রাস ঘটতে পারে।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তিয়ানচেন শুও একই ধারা অনুসরণ করে ভবিষ্যৎ প্রবণতা সম্পর্কে সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। সামগ্রিকভাবে, চীনের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি ধীর হলেও, সরকারী লক্ষ্য পূরণের জন্য পরিসংখ্যানিকভাবে যথেষ্ট বলে গণ্য করা হচ্ছে। তবে, রিয়েল এস্টেট সেক্টরের গভীর সমস্যার সমাধান না হলে, ভবিষ্যতে বৃদ্ধির হার আরও হ্রাস পেতে পারে এবং বাজারের অস্থিরতা বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, রিয়েল এস্টেটের অতিরিক্ত মজুদকে সাশ্রয়ী বাসস্থানে রূপান্তর, ঋণ কাঠামোকে পুনর্গঠন এবং ভোক্তা আস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য লক্ষ্যভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ ধরনের পদক্ষেপ না নিলে, চীনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ধীরগতি বজায় রাখবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তার প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, চীনের ২০২৫ সালের অর্থনৈতিক লক্ষ্য প্রায় পাঁচ শতাংশের আশেপাশে থাকলেও, বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে রিয়েল এস্টেটের অবনতি এবং বিনিয়োগের হ্রাস বৃদ্ধির গতি সীমিত করতে পারে। সরকারকে বাস্তবিক ভিত্তিতে নীতি গঠন করে বাজারের কাঠামোগত সমস্যাগুলি সমাধান করা জরুরি, যাতে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও টেকসই বৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায়।



