ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা (ফ্রন্টেক্স) ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, সমুদ্র ও অনিয়মিত রুটের মাধ্যমে ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশকারী মোট সংখ্যা ২০২৫ সালে ২৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে একই বছরে ভূমধ্যসাগর রুটে প্রবেশকারী অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকদের সংখ্যা শীর্ষে রয়ে গেছে।
ফ্রন্টেক্সের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্তের বাইরে থেকে সমুদ্র ও অনিয়মিত পথে মোট ১ লাখ ৭৮ হাজার (১,৭৮,০০০) মানুষ অবৈধভাবে ইউরোপে পৌঁছেছে। এদের মধ্যে মাত্র ভূমধ্যসাগর রুটে ৬৬ হাজার ৩২৮ (৬৬,৩২৮) জন প্রবেশ করেছে।
ভূমধ্যসাগর রুটে প্রবেশকারী অভিবাসীদের জাতীয়তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশি নাগরিকদের সংখ্যা সর্বোচ্চ, তারপরে মিশর এবং তৃতীয় স্থানে ইরিত্রিয়া। এই তিনটি দেশই পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাসের পরেও শীর্ষে রয়ে গেছে।
ফ্রন্টেক্স উল্লেখ করেছে যে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের মোট অবৈধ প্রবেশের সংখ্যা অর্ধেকেরও কমে গেছে এবং ২০২১ সালের পর সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। সংস্থার মতে, ইউরোপের সীমান্ত পরিস্থিতি, সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানব পাচার নেটওয়ার্কের সক্রিয়তা অনুযায়ী প্রবেশের চাপ এক রুট থেকে অন্য রুটে সরে যেতে পারে।
কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগর রুটে সবচেয়ে বেশি মানুষ লিবিয়া থেকে ইতালির দিকে যাত্রা করেছে। এই পথে বাংলাদেশি নাগরিকদের অংশ বিশেষভাবে বেশি, যা পূর্বের বছরের তুলনায় স্পষ্ট বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
অন্যদিকে, পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও পশ্চিম বলকান রুটের মাধ্যমে অবৈধ প্রবেশের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। তবে পূর্ব লিবিয়া থেকে গ্রীসের ক্রিট দ্বীপে প্রবেশের সংখ্যা তিন গুণের বেশি বেড়েছে, যেখানে মোট ৫১ হাজার ৩৯৯ (৫১,৩৯৯) জন অভিবাসী এই রুটে ইউরোপে পৌঁছেছে। এ গোষ্ঠীর বেশিরভাগই আফগানিস্তান, সুদান এবং মিশরের নাগরিক।
পশ্চিম আফ্রিকা রুটের সামগ্রিক প্রবেশের সংখ্যা সামান্য কমেছে, তবে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরের এই রুটে আলজেরিয়া, সোমালিয়া এবং মরক্কোর নাগরিকদের অংশ সর্বোচ্চ। এই প্রবেশকারীরা প্রধানত স্পেন ও ইতালির তটবন্দরে পৌঁছায়।
ফ্রন্টেক্স ২০২৬ সালে ইউরোপের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। আগামী জুন থেকে নতুন মাইগ্রেশন ও আশ্রয় চুক্তি সম্পূর্ণ কার্যকর হবে, পাশাপাশি নতুন এন্ট্রি-এক্সিট ব্যবস্থা এবং ভ্রমণ অনুমোদন পদ্ধতি চালু হবে। এই পদক্ষেপগুলোকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবিক সুরক্ষার সমন্বয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সাগরপথে প্রবেশের সংখ্যা হ্রাস পেলেও ঝুঁকি কমেনি। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর রুটে অন্তত ১ হাজার ৮৭৮ (১,৮৭৮) জনের মৃত্যু ঘটেছে, যা সমুদ্রপথে যাত্রার বিপদকে পুনরায় তুলে ধরেছে।
একজন আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতি এখন রুটের বৈচিত্র্যকে বিবেচনা করে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে, বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে মানবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য।” তিনি আরও যোগ করেন যে, নতুন চুক্তি ও ভ্রমণ অনুমোদন পদ্ধতি কার্যকর হলে অবৈধ প্রবেশের চাপ কিছুটা কমতে পারে, তবে মূল কারণগুলো—সংঘাত, দারিদ্র্য এবং মানব পাচার—দূর করতে দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
ফ্রন্টেক্সের এই প্রতিবেদন ইউরোপের অভিবাসন প্রবণতার সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে স্পষ্টভাবে চিত্রিত করে এবং ভবিষ্যৎ নীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারকদের জন্য এই তথ্যগুলো কূটনৈতিক সংলাপ ও মানবিক সহায়তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।



