ইরানে চলমান প্রতিবাদ দমন ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বৃহস্পতিবার স্পষ্টভাবে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা জানিয়ে দেশীয় স্থিতিশীলতা রক্ষাকে অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন।
ফিদান ইস্তাম্বুলে একটি সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোকে বাহ্যিক শক্তি হস্তক্ষেপ না করে নিজস্ব উদ্যোগে সমাধান করা উচিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তুরস্কের প্রধান লক্ষ্য হল এমন কোনো পরিস্থিতি এড়ানো যেখানে শক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়।
ইরানের নেতৃত্ব বর্তমানে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা মোকাবেলা করার চেষ্টা করছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিবাদকারীদের পক্ষে হস্তক্ষেপের হুমকি ইরানকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তেহরান তুরস্কসহ প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করে জানিয়েছে, যদি ওয়াশিংটন সরাসরি হামলা চালায়, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে আঘাত হানবে।
ফিদান এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির মধ্যে দু’দফা ফোনালাপের মাধ্যমে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে সংলাপের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। উভয় পক্ষই কূটনৈতিক পথের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
একই সময়ে তুর্কি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সাথেও যোগাযোগ বজায় রেখেছে, কারণ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি সংলাপ বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। এই দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের মাধ্যমে তুরস্ক অঞ্চলীয় নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে চায়।
ফিদান সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন, তুরস্কের কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে এবং আঙ্কারা আশা করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সংলাপের মাধ্যমে পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে। তিনি বলেন, “আমরা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের বিপক্ষে এবং ইরানকে তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো নিজ উদ্যোগে সমাধান করতে হবে।” এই বক্তব্য তুরস্কের নীতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, তেহরান ও ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আঙ্কারার সমর্থন পায় না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানে ব্যাপক অস্থিতিশীলতা পুরো অঞ্চলের জন্যই বিপজ্জনক এবং তা রোধের জন্য সংলাপই একমাত্র কার্যকর উপায়।
ইরানের কঠোর অবস্থান ও প্রতিবাদ দমনের পদ্ধতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তুরস্কের স্পষ্ট বিরোধিতা এবং সংলাপের আহ্বান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়ে তুললেও, তুরস্কের মধ্যস্থতা ভূমিকা অঞ্চলের শান্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রতিবাদে নিহত ও আহতের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তুরস্কের নীতি আরও স্পষ্ট হয়েছে; তারা কোনো সামরিক হস্তক্ষেপকে স্বীকার করে না এবং কূটনৈতিক চ্যানেলকে শক্তিশালী করে সমস্যার সমাধান করতে চায়। এই অবস্থান তুরস্কের পারস্পরিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রতি অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে।
ইরানের সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সংলাপের স্থগিত হওয়ায় তুরস্কের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুরস্কের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও সংলাপের আহ্বান উভয় পক্ষকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে বসাতে সহায়তা করতে পারে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, তুরস্কের এই অবস্থান তার নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ ইরানের অস্থিতিশীলতা তুরস্কের সীমান্তের নিকটবর্তী অঞ্চলে শরণার্থী প্রবাহ ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই তুরস্কের কূটনৈতিক পদক্ষেপকে কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে তুরস্কের কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলাফল কী হবে তা এখনও অনিশ্চিত, তবে বর্তমান অবস্থায় তুরস্কের স্পষ্ট বিরোধিতা এবং সংলাপের আহ্বান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জটিলতা কমাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



