ক্রেমলিনে নতুন রাষ্ট্রদূতদের সমক্ষে উপস্থাপিত পরিচয়পত্র অনুষ্ঠানে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন তার প্রথম বিদেশ নীতি সংক্রান্ত মন্তব্য করেন। তিনি উপস্থিতদের জানিয়ে দেন যে, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিবেশে একতরফা ভাষণ ও জোরপূর্বক ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া প্রচলিত হয়ে গেছে, যা তিনি নিন্দা করেন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি রাশিয়ার ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করতে চেয়েছেন।
পুতিনের এই মন্তব্যের আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পদক্ষেপ—যেমন ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুতি, ইরানে চলমান প্রতিবাদ এবং গ্রিনল্যান্ড নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি—সম্পর্কে তিনি কোনো সরাসরি মন্তব্য করেননি। যদিও এই বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে, পুতিনের ভাষণে কোনো দেশ বা ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
নতুন রাষ্ট্রদূতদের উদ্দেশ্যে তার বক্তব্যে পুতিন একতরফা ভাষণের মূল বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কিছু দেশ শক্তির জোরে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়, অন্যদের উপদেশ দেয় এবং আদেশ জারি করে, যা তিনি বৈধ বলে গণ্য করে। এ ধরনের একতরফা আচরণ আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ও সমতা নীতির বিরোধী, এ কথায় তিনি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন।
এর পাশাপাশি পুতিন রাশিয়ার বহুমুখী বিশ্বের আদর্শে অটল প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, রাশিয়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পারস্পরিক সম্মান এবং সমতা ভিত্তিক বিশ্ব গঠনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে ইচ্ছুক। এই অবস্থান রাশিয়ার পূর্বে গৃহীত বহুপাক্ষিক নীতির ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
ইউরোপে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের জন্য রাশিয়ার প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা করার আহ্বান পুতিন জানান। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোকে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিকল্পনা বিবেচনা করতে এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সমাধান খুঁজতে অনুরোধ করেন। এই আহ্বান রাশিয়ার নিরাপত্তা কৌশলের পুনর্গঠন ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা সংলাপের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্যে।
পুতিন আশা প্রকাশ করেন যে, রাশিয়ার প্রস্তাবিত নিরাপত্তা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা শিগগিরই স্বীকৃত হবে, অথবা ভবিষ্যতে স্বীকৃতি পাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত রাশিয়া তার কূটনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য অনুসরণে অবিচল থাকবে, তিনি জোর দিয়ে বলেন। এই বক্তব্য রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
পুতিনের মন্তব্যের পটভূমিতে ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত রয়েছে, যা ১৯৬২ সালের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর থেকে রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে সর্ববৃহৎ সংঘাত হিসেবে বিবেচিত। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামো ও বহুপাক্ষিক নীতি পুনর্বিবেচনা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন গতিপথ তৈরি করতে পারে।
পুতিনের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ইউরোপীয় নিরাপত্তা সংলাপে প্রভাব ফেলতে পারে। রাশিয়ার প্রস্তাবিত কাঠামো যদি গ্রহণযোগ্যতা পায়, তবে ইউরোপীয় দেশগুলোকে রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা বিষয়ক সমন্বয় বাড়াতে হবে, যা পূর্বে বিদ্যমান উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি যদি রাশিয়ার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে, তবে ইউরোপীয় নিরাপত্তা আলোচনার জটিলতা বাড়তে পারে।
সারসংক্ষেপে, পুতিনের ক্রেমলিনে নতুন রাষ্ট্রদূতদের সমক্ষে দেওয়া বক্তব্য রাশিয়ার বহুপাক্ষিক বিশ্বদৃষ্টিকোণকে পুনরায় জোরদার করে এবং ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন আলোচনার দরজা খুলে দেয়। একতরফা শক্তি-প্রয়োগের সমালোচনা ও রাশিয়ার কূটনৈতিক লক্ষ্য স্পষ্ট করে, এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে রাশিয়ার অবস্থানকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করার সম্ভাবনা তৈরি করে।



