ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) ২০২৬ সালের গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্টে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবেশের প্রধান ঝুঁকিগুলো নির্ধারণ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপরাধ ও অবৈধ আর্থিক কার্যকলাপ দেশীয় বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য সর্বোচ্চ হুমকি হিসেবে চিহ্নিত। এই ঝুঁকি সরাসরি বিনিয়োগের আকর্ষণ, ব্যাংকিং সেক্টরের স্বাস্থ্যের এবং বাণিজ্যিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রথম স্থানে অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক তৎপরতা থাকায়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণের কঠোরতা নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধমূলক কার্যকলাপের বৃদ্ধি ঋণ সংগ্রহ, সম্পদ সুরক্ষা এবং ক্রেডিট রেটিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং রপ্তানি-আমদানি চক্রকে ধীর করে দিতে পারে।
দ্বিতীয় প্রধান ঝুঁকি হিসেবে ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাতকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক নীতি এবং বিনিয়োগের পূর্ব যাচাই প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের বাধা বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারের প্রবেশযোগ্যতা সীমিত করতে পারে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানি-নির্ভর গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল সেক্টরে শুল্কের পরিবর্তন সরাসরি মুনাফা মার্জিনকে প্রভাবিত করবে।
তৃতীয় ঝুঁকি হিসেবে মূল্যস্ফীতি উল্লেখ করা হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে ভোক্তা ব্যয় ক্ষমতা হ্রাস পায়, ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যায়। একই সঙ্গে, উৎপাদন খরচের বৃদ্ধি ব্যবসার লাভজনকতা হ্রাস করে এবং মজুরির চাপ বাড়ায়, যা শ্রমিক বাজারে মজবুত সমন্বয় প্রয়োজন করে।
চতুর্থ ঝুঁকি হিসেবে অর্থনৈতিক ধীরগতি চিহ্নিত হয়েছে। মন্দা বা স্থবিরতার সম্ভাবনা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার কমে গেলে শিল্পখাতে কর্মসংস্থান হ্রাস পেতে পারে, যা বেকারত্বের হার বাড়িয়ে সামাজিক চাপ বাড়িয়ে তুলবে।
পঞ্চম ঝুঁকি হল ঋণবহুলতা, যার মধ্যে সরকারি, কর্পোরেট ও পারিবারিক ঋণ অন্তর্ভুক্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় ও বিদেশি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং বাজেটের বড় অংশ এখন ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। সুদের বোঝা বাড়ার ফলে সরকারি খাতে বিনিয়োগের ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধীর হয়ে যায়।
এই বিশ্লেষণটি ২০২৫ সালের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফল। জরিপে ৩৪টি বিষয়ের মধ্যে দুই বছরের ঝুঁকি চিহ্নিত করার জন্য কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের মতামত সংগ্রহ করা হয়। এই পদ্ধতি দেশীয় ব্যবসায়িক নেতাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ঝুঁকির অগ্রাধিকার নির্ধারণে সহায়তা করেছে।
প্রতিবেদনটি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের উল্লেখও করে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অসন্তোষের ফলে জনমত ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদে রূপ নেয়, যা অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়। শ্রীলঙ্কা ও নেপালের ক্ষেত্রে একই ধরনের সামাজিক অস্থিরতা দেখা গিয়েছে, যা আঞ্চলিক বাজারের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে।
গ্লোবাল দৃষ্টিকোণ থেকে ডব্লিউইএফ ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ঝুঁকি হিসেবে ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাতকে তালিকাভুক্ত করেছে। এর পরবর্তী চারটি ঝুঁকি হল রাষ্ট্রীয় সংঘাত, চরম আবহাওয়া, সামাজিক মেরুকরণ এবং ভুল তথ্যের বিস্তার। এই বৈশ্বিক প্রবণতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি ও বাজার কৌশল গঠনে প্রাসঙ্গিক প্রভাব ফেলবে।
বাজার বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে, এই ঝুঁকিগুলোকে মোকাবিলার জন্য নীতিনির্ধারকদের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন করা জরুরি। একই সঙ্গে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মনিটারি পলিসি সমন্বয় এবং অবকাঠামো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদী তহবিল নিশ্চিত করা ব্যবসায়িক পরিবেশকে স্থিতিশীল করতে পারে। সংক্ষেপে, অপরাধ, ভূ-অর্থনৈতিক উত্তেজনা, মুদ্রাস্ফীতি, ধীরগতি এবং ঋণবহুলতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে নির্ধারণের মূল উপাদান হিসেবে রয়ে গেছে।



