ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজা উপত্যকার কিছু স্থানে তার যুদ্ধবিরতির হলুদ রেখা চিহ্নিতকারী কংক্রিট ব্লকগুলোকে মূল সীমানার চেয়ে গভীর স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। এই পরিবর্তনটি স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে এবং গাজা বাসিন্দাদের নিরাপত্তা সম্পর্কে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিবিসি ভেরিফাই দল যে স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করেছে, তাতে দেখা যায় অন্তত তিনটি এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনী প্রথমে ব্লক বসিয়ে পরে সেগুলোকে গাজা ভূখণ্ডের ভিতরে টেনে নিয়ে গেছে। এই কাজটি অক্টোবরের শেষের দিকে শুরু হওয়া সতর্কবার্তার পরপরই ঘটেছে।
বেইত লাহিয়া, জাবালিয়া এবং আল‑তুফফা পাড়া সহ বিভিন্ন স্থানে মোট ১৬টি চিহ্নিত অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে। প্রতিটি স্থানান্তর গাজা ভূখণ্ডের ভিতরে আরও দূরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ফলে মূল হলুদ রেখা থেকে দূরত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষ করে আল‑তুফফা পাড়ায়, যেখানে ২৭ নভেম্বর থেকে ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে সাতটি ব্লক পুনরায় স্থাপন করা হয়েছে, গড়ে ২৯৫ মিটার (৯৬৮ ফুট) দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই স্থানান্তরগুলো গাজা শহরের উত্তর অংশে ঘটেছে, যেখানে জনসংখ্যা ঘনত্ব বেশি।
বিবিসি ভেরিফাই আরও ২০৫টি অন্যান্য চিহ্নিত ব্লকের অবস্থান ম্যাপ করেছে। এদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি মূল মানচিত্রে চিহ্নিত হলুদ রেখার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে গাজা ভূখণ্ডের ভিতরে স্থাপন করা হয়েছে, যা সীমার স্পষ্টতা হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর মুখপাত্র এই পরিবর্তনকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন যে হলুদ রেখা কোনোভাবে সরানো হয়নি এবং ব্লকগুলো বর্তমান পরিস্থিতি ও অপারেশনাল মূল্যায়নের ভিত্তিতে স্থাপন করা হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে এই চিহ্নগুলোকে মাঠে বাস্তবিকভাবে দৃশ্যমান করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইস্রায়েল কাটজ অক্টোবর মাসে উল্লেখ করেন যে হলুদ রেখা অতিক্রমকারী যে কোনো ব্যক্তি “অগ্নি দিয়ে মোকাবিলা করা হবে”। সেই থেকে এই রেখার আশেপাশে বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে গাজা জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রায় দশ কিলোমিটার (ছয় মাইল) দীর্ঘ অংশে কোনো ব্লক স্থাপন করা হয়নি, ফলে গাজা বাসিন্দারা জানেন না কখন তারা “বিপজ্জনক যুদ্ধক্ষেত্র” এর মধ্যে প্রবেশ করছেন। এই অনিশ্চয়তা তাদের দৈনন্দিন চলাচল ও মানবিক সাহায্য গ্রহণে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হামাসের সঙ্গে গৃহীত যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে ইসরায়েলকে হলুদ রেখার বাইরে সৈন্যবাহিনী প্রত্যাহার করতে বলা হয়েছিল। এই রেখা ইসরায়েলি সামরিক মানচিত্রে হলুদ রঙে চিহ্নিত এবং মাঠে কংক্রিট ব্লক দিয়ে দৃশ্যমান করা হয়।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে এই ধরনের সীমা পরিবর্তন যুদ্ধবিরতির পর্যবেক্ষণকে জটিল করে তুলতে পারে। এক কূটনৈতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, “হলুদ রেখার পুনঃস্থাপন গাজা‑ইসরায়েল সংঘাতের সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে নষ্ট করে এবং শান্তি প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে।”
অতীতের সংঘাতেও সীমানা চিহ্নের পরিবর্তন প্রায়ই নতুন উত্তেজনা ও বিরোধের জন্ম দিয়েছে। গাজা পরিস্থিতিতে একই রকম পরিবর্তন হলে উভয় পক্ষের মধ্যে অতিরিক্ত সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়তে পারে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
গাজা বাসিন্দারা এখনও জানেন না কোন অংশে তারা নিরাপদ এবং কোন অংশে তারা “যুদ্ধক্ষেত্র” হিসেবে বিবেচিত হবে। এই অনিশ্চয়তা মানবিক সাহায্য পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করছে এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার পথে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।



