ইরানের বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদে নিহতদের দেহ সরকারী হাসপাতাল ও মর্টুয়ারিতে আটকে রাখা হচ্ছে, আর নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেকে দেহ মুক্তির শর্তে বিশাল অর্থের দাবি করা হচ্ছে। পরিবারগুলোকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা না দিলে দেহ ফেরত দেওয়া হয় না, ফলে শোকের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক সংকটও সৃষ্টি হচ্ছে।
দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলমান প্রতিবাদে মোট ২,৪৩৫ জনের মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে, যা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও মানবাধিকার অবস্থার ওপর আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
উত্তরের রাশ্ত শহরে এক পরিবারকে ৭০০ মিলিয়ন তোমান (প্রায় ৫,০০০ ডলার) পরিশোধের দাবি করা হয়, যাতে তাদের প্রিয়জনের দেহ পোরসিনা হাসপাতালের মর্টুয়ারি থেকে নেওয়া যায়। একই সময়ে, তেহরানের একটি কুর্দি শ্রমিকের পরিবারকে এক বিলিয়ন তোমান (প্রায় ৭,০০০ ডলার) দিতে বলা হয়, যা তাদের সামর্থ্যের বাইরে।
এই দুইটি উদাহরণই দেখায় যে নিরাপত্তা বাহিনীর আর্থিক শর্তগুলো কতটা কঠোর, বিশেষ করে যখন অনেক শ্রমিকের মাসিক আয় ১০০ ডলারের নিচে সীমাবদ্ধ। ফলে পরিবারগুলো প্রায়শই দেহ ছাড়া ফিরে আসে, শোকের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়।
কিছু হাসপাতালের কর্মী পরিবারকে আগাম ফোন করে দেহ সংগ্রহের জন্য সময়সীমা জানিয়ে দেয়, যাতে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত শোষণ রোধ করা যায়। তবে এই সতর্কতা সত্ত্বেও অনেক পরিবারকে হুমকি ও আর্থিক চাপে ধরা পড়ে।
একজন নারী, যার নাম প্রকাশ করা হয়নি, ৯ জানুয়ারি তার স্বামীর মৃত্যুর খবর হঠাৎ ফোনে পেয়েছেন। হাসপাতালের কর্মীরা তাকে দ্রুত দেহ সংগ্রহের জন্য আহ্বান জানায়, অন্যথায় নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা চাওয়া হবে। তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে গাড়িতে সাত ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে গৃহে পৌঁছে দেহকে গাড়ির পেছনের অংশে রাখেন এবং শেষ পর্যন্ত দেহটি সমাধি করেন।
এই ঘটনার পটভূমিতে ইরানের নির্মাণ শ্রমিকদের গড় মাসিক আয় ১০০ ডলারের নিচে, যা উল্লেখযোগ্যভাবে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য সীমার কাছাকাছি। তাই এক বিলিয়ন তোমানের দাবি তাদের জন্য অপ্রাপ্য, এবং শোকের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক দারিদ্র্যও বাড়িয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবেদন ইউএন মানবাধিকার কাউন্সিলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কায়রোর সদর দফতরে বসে থাকা ইউএন বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেছেন যে, দেহের ওপর আর্থিক শর্ত আরোপ করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
“ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর এই ধরনের আর্থিক চাপে শোকের সময়ে পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত কষ্টে ফেলছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের বিরোধী,” এক মার্কিন কূটনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন। তিনি আরও যোগ করেন যে, এই ধরনের আচরণ ইরানের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং মানবাধিকার সংস্থার তীব্র সমালোচনার মুখে ফেলতে পারে।
দূতাবাস ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে ইরানের সরকারকে দেহ মুক্তির শর্তে আর্থিক দাবি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু সদস্য রাষ্ট্রও ইরানের নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা করার জন্য কূটনৈতিক নোট পাঠিয়েছে, যাতে শোকের সময়ে পরিবারগুলোকে আর্থিক শোষণ থেকে রক্ষা করা যায়।
এই পরিস্থিতি ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের উদাহরণ। যদি নিরাপত্তা বাহিনীর আর্থিক শর্তগুলো অব্যাহত থাকে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের সম্ভাবনা বাড়বে।



