ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বৃহস্পতিবার বিকালের ১২টা ২২ মিনিটে এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখা যায়। অবসরপ্রাপ্ত অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাত, যিনি দুদকের মামলায় হাজতখানা থেকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলেন, আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার কন্যা অরণি বারকাত, যিনি বারবার তার দিকে তাকিয়ে চোখে অশ্রু জমা দেখতে পাচ্ছিলেন।
অরণি বারকাতের চোখে জল দেখা মাত্রই তিনি মুখ ঘুরিয়ে অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করেন, আর অধ্যাপক বারকাতও একই সময়ে চোখে জল নিয়ে থেমে যান। দুজনের এই আবেগপূর্ণ মুহূর্তটি আদালতের এক কোণে ঘটতে দেখে অরণি নিজেকে আড়ালে লুকিয়ে নেন।
অধ্যাপক বারকাতের এক আত্মীয় জানিয়েছেন যে, প্রায় সাত মাস ধরে তিনি জেলখানায় ছিলেন এবং এই মামলায় পাঁচজন সহ-আসামি জামিন পেয়েছেন। তবে আর্থিক সমস্যার কারণে তিনি যথাযথ আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেননি, ফলে এখনো জামিন পাওয়া যায়নি। আত্মীয়ের মতে, তিনি সাধারণ মানুষ এবং কীভাবে দ্রুত জামিন পাওয়া যায় তা জানেন না।
সকাল ১০টায় দুদকের মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানির জন্য অধ্যাপককে হাজতখানায় রাখা হয়। প্রায় এক ঘন্টার বেশি সময় পরে তাকে আদালতে তোলার জন্য বের করা হয়। তোলার সময় তার শরীরে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেট এবং দু’হাতে হাতকড়া ছিল। তিনি কিছুক্ষণ চারপাশে তাকিয়ে পরিচিত কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সহকর্মীর সঙ্গে সালাম বিনিময় করেন।
অধ্যাপক আদালতের কাঠগড়ার ভেতরের বেঞ্চে বসে থাকেন। দুপুর ১২টায় তার কন্যা, জামাতা এবং কয়েকজন নিকট আত্মীয় আদালতে উপস্থিত হন। তাদের দেখেই তিনি আনন্দের সঙ্গে বেঞ্চ থেকে উঠে কাঠগড়ার পেছনের দিকে গিয়ে সবাইকে ইশারায় শুভেচ্ছা জানান।
দুদিনের মামলায় ১২টা ৩৫ মিনিটে অভিযোগ গ্রহণের শুনানি শুরু হয়। অন্য আসামিদের পক্ষে জামিনের আবেদন করা হলেও আদালত তা প্রত্যাখ্যান করে। অভিযোগপত্র গ্রহণের পর আদালত পলাতক সব আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
শুনানির সমাপ্তির পর অধ্যাপককে আবার হেলমেট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট এবং হাতকড়া পরিয়ে হাজতখানায় ফেরত নেওয়া হয়। বের হওয়ার সময় উপস্থিত এক আইনজীবী প্রশ্ন তোলেন যে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, তবু তাকে জঙ্গির মতো আচরণ করা হচ্ছে।
এই ঘটনার পর আদালতে মামলার পরবর্তী শোনানি ও প্রমাণ উপস্থাপনের সময়সূচি নির্ধারিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে পরবর্তী তারিখে উপস্থিত হতে হবে এবং মামলার মূল বিষয়গুলো—অপরাধের প্রকৃতি, প্রমাণের বৈধতা এবং অভিযুক্তদের আইনগত অধিকার—আলোচনা করা হবে। আদালত উল্লেখ করেছে যে, সকল প্রমাণ যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হবে এবং আইন অনুসারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দুদিনের মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ায়, সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া দ্রুত অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে, অধ্যাপক বারকাতের জামিনের আবেদন ও তার আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে আইনজীবী দল অতিরিক্ত সহায়তা চাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ঘটনায় আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিশেষ করে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেটের ব্যবহার, নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুসরণে গুরুত্বারোপ করে। এছাড়া, আদালতে উপস্থিত পরিবারিক সদস্যদের মানসিক অবস্থা ও সহানুভূতি বজায় রাখার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, এই আদালত দৃশ্যটি কেবল এক ব্যক্তিগত দুঃখের প্রকাশ নয়, বরং বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থার মধ্যে সাধারণ নাগরিক ও শিক্ষাবিদদের সম্মুখীন চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন। ভবিষ্যতে মামলার অগ্রগতি ও সংশ্লিষ্ট সকলের অধিকার রক্ষার জন্য যথাযথ আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।



