সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা স্যাম অল্টম্যানের মস্তিষ্ক-কম্পিউটার ইন্টারফেস (BCI) স্টার্টআপ মর্জ ল্যাবস, সম্প্রতি গোপনীয়তা ভেঙে প্রকাশ পেয়েছে। এই মুহূর্তে কোম্পানিটি $২৫০ মিলিয়ন সিড রাউন্ডে তহবিল সংগ্রহ করেছে, যার মোট মূল্যায়ন $৮৫০ মিলিয়ন। তহবিলের মধ্যে OpenAI সবচেয়ে বড় একক চেক প্রদান করেছে, যা এই রাউন্ডের শীর্ষ বিনিয়োগকারী হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
মর্জ ল্যাবস নিজেকে “গবেষণা ল্যাব” হিসেবে উপস্থাপন করে, যার লক্ষ্য জীববৈজ্ঞানিক বুদ্ধিমত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগের মাধ্যমে মানব সক্ষমতা বাড়ানো। প্রতিষ্ঠাতা দল দাবি করে যে, মানব মস্তিষ্কের বিলিয়ন নিউরন থেকে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি পরিবর্তন করে নতুন ধরনের প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব। তারা বিশেষভাবে অ-আক্রমণাত্মক পদ্ধতি ব্যবহার করে নিউরনগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে চায়, যেখানে ইলেকট্রোডের বদলে অণু এবং আল্ট্রাসাউন্ডের মতো গভীর তরঙ্গ ব্যবহার করা হবে।
এই প্রযুক্তি যদি সফল হয়, তবে তা হারিয়ে যাওয়া ক্ষমতা পুনরুদ্ধার, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য উন্নয়ন, এবং মানুষের মধ্যে সংযোগ শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করবে। এছাড়া, উন্নত AI সিস্টেমের সঙ্গে সমন্বয় করে সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তি বাড়ানোর দিকেও দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। মর্জ ল্যাবসের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই সব লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তি বিকাশ করা হবে, যা নিউরনকে অণু স্তরে সংযুক্ত করে তথ্যের আদান-প্রদান সম্ভব করবে।
মর্জ ল্যাবসের এই উদ্যোগ এলন মাস্কের নিউরালিঙ্কের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা হচ্ছে। নিউরালিঙ্কও BCI প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে, তবে তার পদ্ধতি আক্রমণাত্মক সার্জিক্যাল প্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। এতে রোবটিক অস্ত্র ব্যবহার করে স্কালার ছোট অংশ কেটে, সূক্ষ্ম ইলেকট্রোড থ্রেড মস্তিষ্কে প্রবেশ করানো হয়, যা নিউরাল সিগন্যাল রিডিং সম্ভব করে। নিউরালিঙ্কের সর্বশেষ তহবিল সংগ্রহে জুন ২০২৫-এ $৬৫০ মিলিয়ন সিরিজ ই সংগ্রহ করে, যার মূল্যায়ন $৯ বিলিয়ন।
মর্জ ল্যাবসের অ-আক্রমণাত্মক পদ্ধতি এবং নিউরালিঙ্কের আক্রমণাত্মক পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। যদিও উভয়ই মানব মস্তিষ্ক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগের লক্ষ্য রাখে, মর্জ ল্যাবসের ফোকাস বেশি করে মানব ক্ষমতা বৃদ্ধি ও সৃজনশীলতা উন্নয়নে, যেখানে নিউরালিঙ্কের মূল লক্ষ্য পারালাইসিস রোগীদের জন্য চিন্তার মাধ্যমে যন্ত্র নিয়ন্ত্রণের সমাধান প্রদান।
OpenAI এই বিনিয়োগকে BCI প্রযুক্তির নতুন সীমান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। কোম্পানির ব্লগ পোস্টে বলা হয়েছে, মস্তিষ্ক-কম্পিউটার ইন্টারফেস যোগাযোগ, শিক্ষা ও পারস্পরিক ক্রিয়ার নতুন পথ উন্মুক্ত করতে পারে। OpenAI এই ক্ষেত্রকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সমন্বয় করে ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত দিগন্ত প্রসারিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছে।
মর্জ ল্যাবসের তহবিল সংগ্রহের পর থেকে, শিল্পে BCI সম্পর্কিত গবেষণা ও উন্নয়ন দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। অ-আক্রমণাত্মক পদ্ধতির সম্ভাবনা নিয়ে বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়াররা নতুন উপায় অনুসন্ধান করছেন, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন কাজের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদি মর্জ ল্যাবসের প্রযুক্তি সফলভাবে স্কেল করা যায়, তবে তা BCI শিল্পে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে। অ-আক্রমণাত্মক পদ্ধতি রোগীর নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে, ফলে বৃহত্তর ব্যবহারকারী ভিত্তি গড়ে উঠবে।
অন্যদিকে, নিউরালিঙ্কের মতো আক্রমণাত্মক পদ্ধতি এখনও নির্দিষ্ট চিকিৎসা ক্ষেত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে গুরুতর শারীরিক অক্ষমতা মোকাবেলায়। তবে এই পদ্ধতির উচ্চ ঝুঁকি ও ব্যয়জনিত সীমাবদ্ধতা দীর্ঘমেয়াদে বিস্তৃত বাজারে প্রতিযোগিতা করতে বাধা হতে পারে।
OpenAI-এর এই বিনিয়োগ মর্জ ল্যাবসকে কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগও প্রদান করে। ভবিষ্যতে উভয় সংস্থা একসাথে গবেষণা, ডেটা শেয়ারিং এবং প্রযুক্তি সংহতকরণের মাধ্যমে BCI ক্ষেত্রকে দ্রুত অগ্রসর করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, মর্জ ল্যাবসের অ-আক্রমণাত্মক BCI প্রযুক্তি এবং OpenAI-এর বড় বিনিয়োগ সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমে নতুন গতিপথ তৈরি করেছে। এই উদ্যোগের সফলতা মানব মস্তিষ্ক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগকে নতুন মাত্রা দেবে, যা ভবিষ্যতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সৃজনশীল কাজের পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে।



