ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তুরস্কের যোগদানের আলোচনা বর্তমানে চলছে। এই আলোচনার সূচনা মধ্যপ্রাচ্যের যুক্তরাষ্ট্রের বেসে ইরানের সামরিক হুমকির প্রেক্ষাপটে হয়েছে এবং ১৫ জানুয়ারি ইস্তাম্বুলে প্রকাশিত হয়েছে।
ফিদান উল্লেখ করেন, যদিও পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে, তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের জোট আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তুরস্কের এই আগ্রহের পেছনে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে অংশগ্রহণের ইচ্ছা রয়েছে। তুরস্কের প্রতিনিধিরা এই চুক্তিতে যুক্ত হয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সহযোগিতা এবং তার নির্ভরযোগ্যতা তুরস্ককে এই আলোচনায় সক্রিয় রাখার অন্যতম কারণ। ন্যাটো সংস্থার প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরও তুরস্ক এই চুক্তিকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করছে।
ফিদান আরও জানান, কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে তুরস্ক, চীন, সৌদি আরব এবং আজারবাইজান পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক দৃঢ়। তাই কোনো দেশ যদি আক্রমণ করে, তা উভয় দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে।
তুরস্কের যদি এই জোটে সদস্যপদ গ্রহণ করা হয়, তবে তা সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন যুগের সূচনা করবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন। এই ধাপটি দু’দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করবে।
বছরের পর বছর ধরে চলা পারস্পরিক বিরোধের সমাপ্তি ঘটিয়ে, দেশগুলো এখন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রের সমন্বয় বাড়াতে মনোযোগ দিচ্ছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, এই সপ্তাহে আঙ্কারায় প্রথম নৌ-সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা সামরিক সমন্বয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ইরানের প্রতি তুরস্কের দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগ সত্ত্বেও, তুরস্ক বল প্রয়োগের চেয়ে তেহরানের সঙ্গে সংলাপকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই নীতি অঞ্চলে উত্তেজনা হ্রাসে সহায়ক হতে পারে।
তুরস্ক ও সৌদি আরব উভয়ই স্থিতিশীল সিরিয়া এবং ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র স্বীকৃতির পক্ষে সমর্থন প্রকাশ করেছে। এই অবস্থানগুলো তাদের সামগ্রিক কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন জোটের গঠনকে নিরাপত্তা পরিবেশের পরিবর্তনশীল দিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তুরস্কের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
আলোচনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে তুরস্কের প্রতিনিধিরা পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে আরও বিশদ বৈঠক পরিকল্পনা করছে। চুক্তির শর্তাবলী, সামরিক সহযোগিতা এবং যৌথ প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম ইত্যাদি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হবে।
যদি চুক্তি চূড়ান্ত হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন ভারসাম্য তৈরি করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। তুরস্কের কূটনৈতিক চালনা এবং কৌশলগত অবস্থান এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকবে।
অবশেষে, তুরস্কের এই উদ্যোগকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার দরজা খুলে দিতে পারে।



