ইউরোপীয় দেশগুলো গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা জোরদার করতে সামরিক দল পাঠাচ্ছে। ফ্রান্সের ১৫ জন সৈন্যের একটি কন্টিনজেন্ট ইতিমধ্যে রাজধানী নউক‑এ অবতরণ করেছে, আর জার্মানি বৃহস্পতিবারই ১৩ জন সৈন্যকে A400M পরিবহন বিমান দিয়ে পাঠিয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্র‑ডেনমার্কের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের পর নেওয়া হয়েছে, যেখানে ট্রাম্প প্রশাসনের গ্রিনল্যান্ড‑সংক্রান্ত দাবি ও ইউরোপীয় মিত্রদের অবস্থানের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য প্রকাশ পেয়েছে।
ফরাসি সেনাবাহিনীর কন্টিনজেন্ট নউকে পৌঁছানোর পর দ্রুত কার্যক্রম শুরু করেছে, যা দুই দিনের মিশন হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। ফরাসি কর্তৃপক্ষের মতে, এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামরিক শক্তি দ্রুত মোতায়েনের সক্ষমতা প্রদর্শন করা সম্ভব হয়েছে। জার্মানির পাঠানো ১৩ জন সৈন্যের দলও একই সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ডে অবস্থান করবে, যা অঞ্চলের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর একটি সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ফ্রান্সের পাশাপাশি নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস এবং যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনীরও একই মিশনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সুইডেন বুধবারই তার সেনা কর্মকর্তাদের গ্রিনল্যান্ডে পাঠিয়েছে, আর নরওয়ে দুইজন সৈন্য, যুক্তরাজ্য একজন সামরিক কর্মকর্তা এবং নেদারল্যান্ডসের এক নৌ কর্মকর্তা একই সময়ে পাঠাবে। এই বহুমুখী অংশগ্রহণ ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সমন্বয়কে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর সমন্বিত উপস্থিতি ডেনমার্কের নেতৃত্বে পরিচালিত “অপারেশন আর্টিক এন্ডিউরেন্স” নামে পরিচিত। ডেনিশ সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হবে, যেখানে জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন এবং নরওয়ের অবদান থাকবে। এই অপারেশনটি ২০২৬ সাল পর্যন্ত আর্টিক অঞ্চলে সামরিক ক্ষমতা বাড়ানোর ডেনমার্কের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ।
হোয়াইট হাউসে বুধবার অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তারা গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিরোধের মুখোমুখি হয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসন পূর্বে ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখল করার অঙ্গীকারের ইঙ্গিত দিয়েছিল, যা বৈঠকের আলোচনার পটভূমি তৈরি করে। বৈঠকের পর ডেনিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লোক্কে রাসমুসেন উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অবস্থান ভিন্ন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হওয়ার কথা উল্লেখ করে, ডেনমার্কের অবস্থানকে পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, দ্বীপটি বিক্রয়ের জন্য নয় এবং কোনো বলপ্রয়োগের হুমকি “বেপরোয়া” কাজ হিসেবে গণ্য হবে। উভয় পক্ষই ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে, এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। এই অবস্থানই ইউরোপীয় দেশগুলোকে দ্রুত সামরিক সহায়তা প্রদান করার প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
ডেনমার্কের সামরিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সাল পর্যন্ত আর্টিক অঞ্চলে উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। ডেনিশ সশস্ত্র বাহিনীর একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গ্রিনল্যান্ড ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিস্তৃত সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে, যা কেবল ইউরোপীয় মিত্রদের নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থকেও সমর্থন করবে। এই প্রসঙ্গে জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন এবং নরওয়ের অবদানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অপারেশন আর্টিক এন্ডিউরেন্সের অংশ হিসেবে ইউরোপীয় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলে, আর্টিকের নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন গতিবিধি দেখা যাবে। বিশেষত, শীতল জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে, যা সামুদ্রিক ও বায়ু পরিবহন পথের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপ গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আর্টিকের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে।
ভবিষ্যতে ডেনমার্ক ও তার ইউরোপীয় অংশীদাররা গ্রিনল্যান্ডে অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম ও কর্মী মোতায়েনের পরিকল্পনা করতে পারে, বিশেষত শীতকালীন মৌসুমে যেখানে পরিবহন ও যোগাযোগের চ্যালেঞ্জ বাড়ে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো কীভাবে সমাধান হবে, তা পরবর্তী মাসের কূটনৈতিক মিটিং ও উচ্চস্তরের সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
সামগ্রিকভাবে, ইউরোপীয় দেশগুলোর গ্রিনল্যান্ডে সামরিক মোতায়েন কেবল নিরাপত্তা জোরদারই নয়, বরং আর্টিকের কৌশলগত গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন দিক উন্মোচন করেছে। এই পদক্ষেপের ফলাফল অঞ্চলীয় স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।



